হলদিবাড়ি: দলের নির্দেশ অমান্য করে হলদিবাড়ি পুরসভার নতুন বোর্ডে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ফের শপথ নিলেন বিদায়ি চেয়ারম্যান শংকরকুমার দাস ও ভাইস চেয়ারম্যান অমিতাভ বিশ্বাস। নজিরবিহীন এই ঘটনায় কোচবিহার জেলা তৃণমূলে হইচই পড়ে গিয়েছে। মেখলিগঞ্জের বিধায়ক পরেশচন্দ্র অধিকারী জানিয়ে দিয়েছেন, হলদিবাড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যান দলের নির্দেশ অমান্য করেছেন। দলবিরোধী কাজের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজ্যের অন্য পুরসভার মতো হলদিবাড়িতেও নতুন পুর বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল তৃণমূল। দলের জেলা সভাপতি পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন হলদিবাড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে। বহু টালবাহানার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাঁরা পদত্যাগ করেন। গত মাসের ২০ তারিখ বোর্ডের সভায় সকলের উপস্থিতিতে পুরসভার এগজিকিউটিভ রঞ্জিত দাসের হাতে ইস্তফাপত্র তুলে দেন তাঁরা। সেই অনুযায়ী ১৪ দিনের মাথায়, বৃহস্পতিবার নতুন বোর্ড গঠন করা হয়। কিন্তু দলীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে আগের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানই আবার ওই দুটি পদে শপথ নেওয়ায় হইচই পড়ে যায় হলদিবাড়িতে। তৃণমূলের অন্দরেও ব্যাপক কানাঘুষো শুরু হয়।
২০২২ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত পুর নির্বাচনে পুরসভার ১১টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে জয়লাভ করে তৃণমূল। মার্চ মাসের ২২ তারিখ নতুন পুর বোর্ড গঠন করা হয়। পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার শংকরকুমার দাস চেয়ারম্যান ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার অমিতাভ বিশ্বাস সর্বসম্মতিক্রমে ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত হন। কিন্তু লোকসভা ভোটে পুর এলাকায় দলের ভরাডুবি হয়। আগামী বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূলের জেলা নেতৃত্বের কাছ থেকে নতুন বোর্ড গঠনের নির্দেশ আসে। সেখানে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার সৌরভ রায় ওরফে পিয়ালকে চেয়ারম্যান এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার পপি বর্মন রায়কে ভাইস চেয়ারম্যান করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দলের তরফে আসা নির্দেশ অবশ্য ভালোভাবে নেননি পুরসভার ১১ জন কাউন্সিলারের অধিকাংশই। আটজন কাউন্সিলার বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তবে পরবর্তীতে বিধায়কের মধ্যস্থতায় দলীয় নির্দেশ মেনে প্রথমে মহকুমা শাসক ও পরবর্তীতে বোর্ড অফ কাউন্সিলের সামনে পদত্যাগপত্র জমা দেন শংকর ও অমিতাভ।
এদিন পুরসভার চেয়ারম্যানের ঘরে নতুন বোর্ড গঠনের সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে হেড ক্লার্ক ইন্দ্রজিৎ সিনহা ও এগজিকিউটিভ রঞ্জিত দাস ও সাতজন কাউন্সিলার উপস্থিত ছিলেন। গরহাজির ছিলেন সৌরভ ও পপি এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার পূরবী চক্রবর্তী। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার নিখিল দত্ত শংকরকে চেয়ারম্যান করার প্রস্তাব দেন। এরপর শংকর নিজে অমিতাভকে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে প্রস্তাব দেন। উপস্থিত সকলে তাতে সম্মতি জানান। ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলার বিশেষ কাজের জন্য সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও ফোনে নিজের সমর্থন জানান। ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার সুমি দে চেয়ারম্যান পদে শংকরকে এবং শংকর ভাইস চেয়ারম্যান পদে অমিতাভকে শপথবাক্য পাঠ করান।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান শেষ হতেই হইচই পড়ে যায় পুরসভা থেকে তৃণমূলের অন্দরে। দলবিরোধী কাজের অভিযোগ তোলা হয় চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। সভায় উপস্থিত পুরসভার কাউন্সিলাররা অবশ্য দাবি করেছেন, পুরসভা ও দলের স্বার্থেই তাঁরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কাউন্সিলার বিশ্বজিৎ সরকার ও নিখিল দত্ত জানিয়েছেন, হঠাৎ করেই চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা হলে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। এছাড়াও আসন্ন বিধানসভা ভোটে পুর এলাকার ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে। দলের কথা চিন্তা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চেয়ারম্যান পদে শপথ নেওয়ার পর শংকর নির্দেশ অমান্যের প্রশ্ন এড়িয়ে বলেন, ‘অধিকাংশ কাউন্সিলারের সিদ্ধান্তের কারণেই আমি আবার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছি। সকলকে নিয়েই পুর এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি সংগঠন বাড়াতে গুরুত্ব দেব।’
দলের প্রস্তাবিত চেয়ারম্যান সৌরভ বলেন, ‘দলের তরফে চেয়ারম্যান পদের জন্য আমার নাম পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ মানা হয়নি। এই দলবিরোধী কাজের বিষয়টি ইতিমধ্যে দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে জানানো হয়েছে। দল পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’ গরহাজির পূরবী বলেন, ‘দলীয় নির্দেশ উপেক্ষিত হয়েছে। তাই পুরসভার কাউন্সিলারদের বসার ঘরে থাকলেও শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ছিলাম না।’
আগামী মঙ্গলবার কোচবিহারে আসছেন দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগে এমন ঘটনায় চরম অস্বস্তিতে তৃণমূলের জেলা নেতৃত্ব। এদিন দলের কোচবিহার কমিটির সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিককে ফোনে পাওয়া যায়নি। জেলা চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি দলগতভাবে খোঁজ নিচ্ছেন।

