কুয়াশামাখা শীতকাল হোক বা অঝোর বৃষ্টি, এলাকার কেউ মারা গেলে এই ৭৫ বছর বয়সেও শ্মাশানে পৌঁছে যান তিনি। অর্থের অভাবে সৎকারের সামগ্রী কিনতে সমস্যা হলেও ভরসা তিনি। একসময় এলাকার প্রবীণদের তাঁর হাতে সৎকারের ইচ্ছা ছিল। এখনও নীরবে সমাজের কাজ করে চলেছেন মানুষটা। খোঁজ নিলেন কৌশিক দাস
কৌশিক দাস, ক্রান্তি: পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। নেশা পরোপকার। সেই ২০ বছর বয়সে শুরু হয়েছিল। তারপর থেকে এলাকার কেউ মারা গেলেই তাঁর ডাক পড়ে। অর্থাভাবের জন্য কোনও মানুষের সৎকারে অসুবিধা হলেও সবাই তাঁর কাছেই আসেন। ৭৫ বছর বয়সেও কাউকে ফেরান না ক্রান্তি (Kranti) ব্লকের রাজাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের চ্যাংমারি হাটের বাসিন্দা হরিপদ দাস (Haripada Das Social Worker)। হরিপদ ২০ বছর বয়সে প্রথম দেহ সৎকার করেছিলেন, তারপর কেটে গিয়েছে ৫৫টা বছর। এই দীর্ঘসময়ে হরিপদ তিন শতাধিক মানুষের দেহ সৎকার করেছেন। মানুষের আপদে-বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়াই যেন তাঁর মূল লক্ষ্য। এই কারণে এলাকার জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাধারণ বাসিন্দা প্রত্যেকের কাছে হরিপদ শ্রদ্ধার পাত্র।
মৃত্যুশয্যায় বহু প্রবীণ তাঁকে ডেকে অদ্ভুত আবদার করতেন বলে জানান হরিপদ। স্মৃতিরোমন্থন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ বোধহয় নিজের মৃত্যুর সময় বুঝতে পারে। আশপাশের এলাকার অনেক বয়স্ক মানুষ আমাকে বলতেন, হরি আমার কিন্তু ওপারে যাওয়ার সময় হয়ে এল। তুমি কিন্তু এইসময় গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাবে না। প্রিয় হরির হাতেই সৎকার হবে, এটাই ছিল তাঁদের আশা। এখনও এই কথাগুলো ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।’ তিনি যোগ করেন, ‘প্রবীণরা আমাকে এসে বলতেন, হরি, তোমার হাতেই আমার দাহ হবে। আর কী অদ্ভুত ব্যাপার, বলে যাওয়ার কয়েকদিন পরেই তাঁরা মারা যেতেন। আমি তাঁদের শেষ ইচ্ছের মর্যাদা রাখতাম। শীতের ঘন কুয়াশা হোক, কিংবা বৃষ্টির রাত আমি ঠিক শ্মশানে পৌঁছে যেতাম।’
কিন্তু হঠাৎ করে এই কাজে কেন? উত্তরে হরিপদ বলেন, ‘তখন আমার ২০ বছর বয়স। প্রথমবার বাড়ির পাশের এক ব্যক্তির দেহ সৎকার করতে গিয়েছিলাম। ক্রমে সেটাই যেন নেশায় পরিণত হল।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অর্থের অভাবে কারও সৎকারের জন্য কাঠ বা অন্য কিছুর অভাব হলে হরিপদ সেই সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেন। হরিপদ বাড়িতে না পৌঁছানো অবধি অনেক বাড়ি থেকে শবদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় না।
কাঠামবাড়িতে শিক্ষকতার সূত্রে হরিপদকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সম্বল সরকার। তাঁর কথায়, ‘ওনার মতো মানুষই হয় না। নীরবে সমাজের জন্য কাজ করা মানুষ আজকের দিনে বিরল। সৎকার সহযোগিতা করা ছাড়াও কত মানুষকে যে উনি নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না।’ রাজাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সঞ্জয় ওরাওঁ বলেন, ‘উনি আমাদের এলাকার গর্ব। এই বয়সেও উনি যেভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তা থেকে অনেককিছু শেখার আছে।’

