জলপাই গাছ ছিল বলে নাম জলপাইগুড়ি? নাকি জল্পেশ মন্দির থেকে এই নামকরণ? নাকি এসবের কোনওটাই নয়, পুরোনো এক প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জেলার নাম। খোঁজ নিল উত্তরবঙ্গ সংবাদ
সৌরভ দেব, জলপাইগুড়ি: নামেই কি তবে পরিচয়? নাকি পরিচয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকে অন্য কোনও নাম? উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র জলপাইগুড়ি জেলা (History of Jalpaiguri naming) ভাগ হয়ে আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) আলাদা জেলা হয়েছে। সময়ের নিয়মে বদলেছে অনেক কিছু। কিন্তু আজও এক গোলকধাঁধায় আটকে রয়েছে এই শহরের নামকরণের ইতিহাস। স্মৃতির ধুলো ঝাড়লেই উঠে আসে একগুচ্ছ প্রশ্ন— কেন এই শহরের নাম জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri)? উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেউ হাতড়াচ্ছেন গুগল, কেউ বা ফিরে যাচ্ছেন হলুদ হয়ে যাওয়া ইতিহাস বইয়ের পাতায়।


শহরের নতুন প্রজন্মের কাছে এই নামকরণের ইতিহাস যেন স্রেফ ইন্টারনেটের সার্চ রেজাল্ট। জলপাইগুড়ি নামের নেপথ্য কাহিনী জানতে চাইলে কলেজ পড়ুয়া ঋষিরাজ চক্রবর্তী হাতের স্মার্টফোন খুলে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েই বললেন, ‘এখানে তো অনেকগুলো উত্তর দেখাচ্ছে, কোনটা যে ঠিক!’ ঋষিরাজের মতো আজকের প্রজন্মের কাছে নিজের শহরের নামকরণের উৎস আজ এক অমীমাংসিত রহস্য।
অথচ প্রবীণদের কাছে এই নাম মানেই এক টুকরো আবেগ। ৭০ বছর বয়সি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অরুণ সরকার স্মৃতির পাতা উলটে বলেন, ‘আমি একটা লেখায় পড়েছিলাম, এক সময় এই অঞ্চলে প্রচুর জলপাই গাছ ছিল। যার থেকে জলপাইগুড়ি নামকরণ হয়েছে। অনেকেই আবার বলেন জল্পেশ মন্দির থেকে নাকি জলপাইগুড়ির নাম হয়েছে।’
তবে নাম নিয়ে নানা মুনির নানা মতের এখানেই শেষ নয়। ইতিহাসের অলিন্দে কান পাতলে শোনা যায় ভিন্ন সুর। কেউ বলেন, এক সময় এই এলাকা ছিল ভুটানিদের বস্ত্র ব্যবসার কেন্দ্র। সেই ভুটানি শব্দ ‘জে লে পি গু ড়ি’ থেকেই আজকের জলপাইগুড়ি।
তবে, এই নামের শিকড় খুঁজতে গিয়ে ইতিহাসের অনেকটা গভীরে তলিয়ে গিয়েছেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক উমেশ শর্মা। তাঁর কাছে জলপাইগুড়ি মানে কেবল গাছ বা মন্দির নয়, জলপাইগুড়ি মানে এক পরিশ্রমী জনগোষ্ঠীর লড়াই। উমেশ বলেন, ‘এ নিয়ে একাধিক মতভেদ রয়েছে।’ তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে ‘জলপেলিয়া’ সম্প্রদায়ের কথা। রাজবংশী সমাজের এই মানুষগুলো কোচবিহার বা বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে পুজো-অর্চনার জল বয়ে আনতেন।
উমেশ বলছিলেন, ‘তাঁরা জল নিয়ে আসতেন বলেই তাঁদের জলপেলিয়া বলা হত। তৎকালীন সময়ে এই গোষ্ঠীর মানুষরা এখানেই বসবাস করতেন। তাঁদের নাম থেকেই জলপাইগুড়ি হয়েছে বলে আমার মনে হয়।’ সেই ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে আজও স্টেশন সংলগ্ন উত্তর দিকে টিকে আছে ‘জলাদিপাড়া’।
জলপাই গাছ আজ হয়তো আগের মতো নেই, হয়তো বদলে গিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রাও। কিন্তু ‘জলপাইগুড়ি’ নামটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই নানা মত আর মানুষের বিশ্বাসগুলোই আজও শহরটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এক গভীর মায়ায়।

