রূপায়ণ ভট্টাচার্য
রাস্তাঘাট একেবারে শুনসান। মরা দুপুর তো মরা দুপুরই। সামান্য আগে মোড়ের মাথায় দেখে এসেছি, জনা দুই তরুণ-তরুণী নতুনভাবে তৈরি রাস্তার মুখে সেলফি তুলে যাচ্ছে। জনা দুই স্থানীয় মানুষ অতিনির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে রাস্তার গার্ডওয়ালে।
অথচ এই বিশাল চত্বরের গেটের ধারেকাছে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সামনের রাস্তাতেও কেউ নেই। পিছনের রাস্তাতেও কেউ নেই। জাতীয় সড়ক মানে হিলকার্ট রোডের এই অংশটুকু খুব সরু। ডানদিকে যে কয়েকটা বাড়ি, সেগুলোর দরজা বন্ধ। মানুষ যে সেখানে থাকে, তা বোঝার উপায় নেই।
ওই যে বিশাল চত্বরের প্রধান গেটটি বন্ধ রয়েছে, তা দেখলেও বোঝার উপায় নেই, এটা এক ঐতিহাসিক জায়গা। পর্যটকদের তীর্থক্ষেত্র হতে পারত। হয়নি।
অথচ এই ২০২৫ সালেই তার শতবর্ষ ছিল। চলে যাচ্ছে নিঃশব্দে।
হেঁটে চলেছি তিনধারিয়া ওয়ার্কশপের পাশ দিয়ে। নিঃস্তব্ধ চারপাশ। বড় মলিনও। ৫৫ বছর আগে এই ওয়ার্কশপকে কেন্দ্র করে পরিচালক তপন সিংহ তাঁর এক রূপকথা তৈরি করেছিলেন দিলীপকুমার ও তাঁর প্রেমিকা সায়রা বানুকে নিয়ে। সৃষ্টি হয়েছিল ‘সাগিনা মাহাতো’। যে ছবির চর্চা কলকাতা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল মুম্বইয়ে এবং যার রেশ ধরে তৈরি হয়েছিল হিন্দি সিনেমা ‘সাগিনা’।
বিদ্রোহী শ্রমিক সাগিনা মাহাতোর কথা মানুষ জানতে পেরেছিল আরেক সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষের কলম থেকে। শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন ও হাতি মোড়ের মাঝখানে একটি কলোনির নাম সাগিনা মাহাতো কলোনি। অবাক কাণ্ড, সাগিনার আসল কর্মক্ষেত্র তিনধারিয়ায় তাঁকে ভুলেই গিয়েছে মানুষ।
উপর থেকে দেখলে তিনধারিয়ার শতবর্ষ প্রাচীন লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপকে অনেকটা বাতাসিয়া লুপের মতো দেখায়। রেললাইনটি ঠিক ওভাবেই জড়িয়ে রয়েছে ওয়ার্কশপকে।
রোহিণী-কার্সিয়াং রাস্তাটি হওয়ার পর কপাল পুড়েছে সুন্দরী হিলকার্ট রোডের। এত ঘুরে কেউ যেতে চায় না দার্জিলিং। কপাল পুড়েছে এই শতবর্ষ পুরোনো ওয়ার্কশপেরও। পর্যটকরা আর এদিকে আসেন না। রেলেরও বাড়তি উদ্যোগ নেই। এখন রোহিণীর পথ কিছুদিন বন্ধ থাকায় লোকের ও গাড়ির আনাগোনা বেড়েছে। ওয়ার্কশপ বা তিনধারিয়ার ভাগ্য বদলায়নি।
বছর তিনেক আগে একবার ওয়ার্কশপের গেট খোলা দেখে ঢুকে পড়েছিলাম। দেখি, ঢুকে বাঁদিকে একটি ছোট মিউজিয়াম। জনহীন। তার টিকিট কাটতে আবার ছুটতে হয়েছিল তিনধারিয়া রেলস্টেশনে। স্টেশন মাস্টার তখন নেই সেখানে। বেশ কিছুক্ষণ পরে এসে মিউজিয়াম দেখার টিকিট চাই শুনে বেশ অবাক। বলেই ছিলেন, ‘কেউ তো আসে না।’ ১০০ বছরের ওয়ার্কশপটি এমনিতে দেখার মতো। দেখেছিলাম, টয়ট্রেনের ছোট কোচগুলো সারানো হচ্ছে। হাত লাগিয়েছেন মহিলা কর্মীরাও। সিমলা বা উটিতে এমন দেখার সুযোগ নেই।
ইতিহাস কী বলে তিনধারিয়ার ওয়ার্কশপের ১০০ বছরে?
আসলে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলের ইতিহাসে এটাই প্রথম রেল মেইনটেনান্সের জায়গা ছিল না। ১৮৮১ সালে যখন দার্জিলিং পর্যন্ত গেল ন্যারোগেজ লাইন, ওই সময় যাবতীয় সারাইয়ের কাজ চলত তিনধারিয়ার লোকোমোটিভ শেডে। লোকো শেডই কাজ করত ওয়ার্কশপের। ডিএইচআর তখন একদিকে কিশনগঞ্জ পর্যন্ত গিয়েছে, আরেকদিকে তিস্তা ভ্যালিতে। তাই আরও বড় জায়গা দরকার ছিল কামরা বা ইঞ্জিন সারানোর জন্য।
১৯১৩ সালে ঠিক হয়, একটা বড় ওয়ার্কশপ হবে পাহাড়ের রেলকে কেন্দ্র করে। প্রথমে কথা হয়েছিল শিলিগুড়িতেই হবে সেটা। যেখানে কলকাতা, তিস্তা ভ্যালি এবং দার্জিলিং— তিনটে দিকের লাইন রয়েছে। ব্রিটিশ কর্মীরা আপত্তি না করলে শিলিগুড়িই পেত এই ওয়ার্কশপ। তাঁরা আবার শিলিগুড়ির নামে আপত্তি তোলেন সেখানে যথেষ্ট ঠান্ডা না থাকায়। অত গরমে নাকি কাজ করা মুশকিল। তাই ভাবা হয় তিনধারিয়ার কথা। প্রথম কথা, এটা পাহাড় ও সমতলের মাঝামাঝি পড়বে। দ্বিতীয় কথা, এটা পাহাড়ের একেবারে নীচের অংশে।
১২ বছর ধরে কাজ করার পর এই ওয়ার্কশপ তৈরি হয়! ‘দার্জিলিং মেল’ পত্রিকার সম্পাদক ডেভিড চার্লসওয়ার্থ লিখেছিলেন, ‘the mysteries thought to be beyond the gates, were more tantalising than the Willy Wonka factory would have been to children… You have to have been trainspotter to understand the psychological trauma caused by the sight of a railway track disappearing under closed gates!’
তিনধারিয়ার ওয়ার্কশপে গিয়ে শেষবার দেখেছিলাম, অনেক মহিলা কর্মযজ্ঞে শামিল। তবে কাঞ্চনজঙ্ঘা, ধবলগিরি, অন্নপূর্ণার মতো সেলুনকারগুলো চোখে পড়েনি, যেখানে অনেক বিশিষ্টদের টয়ট্রেন চড়ার স্মৃতি জড়িয়ে। সেগুলো আছে তো? সেদিন যে প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঘুরছিল, পরে গিয়ে বারবার সেই প্রশ্নটা তাড়া করে। কার্সিয়াংয়ের ধারে কাছে তো অনেক ছোট ছোট গ্রাম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে, তিনধারিয়া সেটা পারল না কেন? রাজ্য সরকারের পর্যটন দপ্তরও কেন উদ্যোগ নিল না বাড়তি?
কার্সিয়াংকে ঘিরে অনেক ছোট ছোট গ্রামে পর্যটকরা যান। তিনধারিয়ার দিকটা একেবারে বঞ্চিত। রোহিণীর দিকে গত চার বছরে হোটেল, রেস্তোরাঁ হয়ে পালটে গিয়েছে মানচিত্র। ওদিকটা যত উজ্জ্বলতর, তিনধারিয়ার দিকটা ততই ম্লান।
মমতা সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটক টানায় দেশে দু’নম্বর হতে পারে, তাতে রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রীদের কোনও ভূমিকা নেই। বাবুল সুপ্রিয়, ইন্দ্রনীল সেন দুই গায়ক মন্ত্রী ভাগাভাগি করে পর্যটন দপ্তর চালিয়েছেন দীর্ঘদিন। তাঁদের কিন্তু উত্তরবঙ্গে সেভাবে দেখাই যায়নি। তিনধারিয়া খায় না মাথায় দেয়, তা নিয়ে তাঁরা ভাববেন কী করে?
বহু বছর আগে থেকেই শিলিগুড়ি শহর থেকে তিনধারিয়ার আলো দেখা যেত প্রতি সন্ধ্যায়। আজও কেউ গুলমা স্টেশনের উলটোদিকের প্রান্তরে দাঁড়ালে রূপকথার শহরের মতো পাহাড়ে ঝকঝক করবে তিনধারিয়ার রূপ।
এ শহরে লেখক প্রমথ চৌধুরীর দাদা আশুতোষ চৌধুরীর বাড়ি ছিল, সেখানে থেকেছেন রবীন্দ্রনাথ। তার চিহ্ন ছড়ানো ছেটানো গীতাঞ্জলির কিছু কবিতায়। সেই শান্তা ভবনের স্মৃতি মুছে গিয়েছে কার্যত। তিনধারিয়া এলাকায় বাড়ি ছিল বাঙালির গর্ব জেনারেল জয়ন্ত চৌধুরীরও। এখানকার দুর্গাপুজো দেখতে গিদ্দাপাহাড়ের বাড়ি থেকে আসতেন শরৎচন্দ্র বসু।
পুরোনো ইতিহাস আর আজ নেই, তবু তিনধারিয়ার অপার সৌন্দর্য তো আজও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চারদিকে। টয়ট্রেনের সবচেয়ে উপেক্ষিত তিনটি স্টেশন তাকে ঘিরেই। মহানদী, গয়াবাড়ি, চুনাভাটি। অথচ কী চমৎকার গ্রাম! মহানন্দার উৎসস্থল পাগলাঝোরা খুব কাছে। এই অঞ্চলেই টয়ট্রেনের বহুচর্চিত জিগ জ্যাগ প্রথার লুপ দেখা যায়। তিনধারিয়া থেকে চমৎকার দেখা যায় সমতলের বাড়িগুলো। প্রচুর প্রেমিক প্রেমিকা মোটর সাইকেলে ঘুরতে আসে বিকেলের দিকে। তবু এই জায়গা কেন পর্যটনকেন্দ্র হল না, এই প্রশ্নটা বারবার তাড়া করবে।
২০২৫— বিভিন্ন দিক থেকে শিলিগুড়ি বা দার্জিলিংয়ের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২৫ সালে তিনধারিয়া ওয়ার্কশপ হওয়ার পাশাপাশি শিলিগুড়িতে প্রথম চালু হয়েছিল বাস। সে বছরই দার্জিলিংয়ে অকালে প্রয়াত হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। শিলিগুড়িতে টয়ট্রেনে এনে তাঁর দেহ দার্জিলিং মেলে পাঠানো হয় কলকাতা। রবীন্দ্রনাথকে মনে রেখেও বলা যায়, এত ভিড় কোনও বঙ্গসন্তানের শেষযাত্রায় হয়নি। অথচ দেশবন্ধুর প্রয়াণের শতবর্ষের দিন মনে আছে, শিলিগুড়িতে কিছুই হয়নি। বাসযাত্রা যাঁর হাত ধরে শুরু হয়েছিল, সেই হুজুর সিংয়ের অস্তিত্বও ভুলে গিয়েছে শিলিগুড়ি।
তিনধারিয়া ওয়ার্কশপের ভাগ্যেও সেই রকমই প্রবল উপেক্ষা জুটল পুরো বছর ধরে। আবার সেই চরম ঔদাসীন্য, চরম নিঃস্তব্ধতা! অথচ তিনধারিয়া ওয়ার্কশপ উত্তরবঙ্গের সোনার ইতিহাসের এক টুকরো। তার গেটে পড়ে থাকে উপেক্ষার বর্ণমালা। কাঁদে শুধু।

