(তালাবন্ধ গুদামে পুড়ছে প্রান্তিক শ্রমিকের স্বপ্ন ও অধিকার, তবু নির্বিকার আমাদের শিক্ষিত সমাজ ও প্রশাসন।)
সেবন্তী ঘোষ
ঘরে তালা দিই কারণ অবাঞ্ছিত ব্যক্তির প্রবেশ রোধ করতে চাই আমরা। যদিও খুট করে সে তালাটি ভেঙে ঢুকে পড়বে চোর, বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোয় সিঁধ কাটবে সিঁধেল, সশব্দে সে তালা ফাটিয়ে ঢুকে পড়বে ডাকাত। তারপরেও নাম্বার লক পড়বে সুটকেসে, শোয়ার ঘরে, গলি, ছাদ আর প্রবেশপথের প্রধান দরজায় পড়বে আটক যন্ত্র। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বা অর্জিত সম্পত্তির নিরাপত্তার জন্য তালা অতি প্রয়োজনীয়। এ কথা সবাই মানবেন যে, তালাচাবির কোনও বিকল্প নেই। এই পদ্ধতি ছাড়া আমার আপনার এক পাও চলবে না। সত্য যুগে নাকি চলত। দরজা টেনে রেখে নগরভ্রমণে চলে যেত সুরসুন্দরী ও রসিক পুরুষ। গ্রামীণ জীবনে সেসবের বালাই নাও থাকতে পারে কারণ দুটি মাটির হাঁড়ি পাতিল আর কাঁথা বালিশ, শিকেয় ঝোলানো দধিভাণ্ড ছাড়া চোরে নেবেই বা কি? তবু আপনার সন্দিগ্ধ মন খচখচ করবে। ভ্রমণকালীন দর্শনে প্রায় সর্বত্র, প্রাচীন বাড়িগুলিতে শিকলের ব্যবহার দেখেছেন। লোহার ইয়া বড় মালা যেন। শিকলটুকু টেনে তুলে দেওয়া মানেই তো তালাবন্ধ। কাকে তালাবন্ধ রাখত তারা? অবাধ্য সন্তান, স্বাধীনচেতা বৌ, না দামি পরিচারককে, যাকে ক্রীতদাসও বলা যায়?
উৎসবের নেপথ্যে জতুগৃহের আয়োজন
অন্যদিকে সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে বহিঃশত্রুর জন্য তালার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু যে শত্রু নয় আদৌ? যাঁদের দ্বারা আমাদের তথাকথিত সভ্যতার চাকা এগিয়ে চলেছে, তাঁরাই যদি হয় বদ্ধভূমির উৎসর্গিত প্রাণ? আসলে এঁরা আমাদের বন্ধু শত্রু কোনওটাই নয়, একটি অভিধায় যদি চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে তাঁদের বলা যায় ‘অপর’। এঁরা ভদ্রলোক সমাজের বাইরে, ফলে আমাদের মনের দরজার তালা খুলে ভেতরে ঢোকার সাধ্য নেই। আমাদের যাবতীয় গল্পের বাইরে এঁরা পড়ে থাকেন। যদি না বড় কোনও একটা কাণ্ডাকাণ্ড ঘটে যায়, এঁদের কথা আমাদের স্মরণে আসে না। যেমন এখন মোমো কারখানার ভয়ানক কতগুলি মৃত্যুর পর গল্পের কত রকম হাত-পা ছড়াচ্ছে। যে জলাভূমি বুজিয়ে কারখানা হয়েছে তা ভরাট হয়েছে বাম আমলে। কেন বাম আমলে এই অনুমতি দেওয়া হল? যদি না দেওয়া হত তাহলে এই কারখানা হত না। রাম যদি না জন্মাত তাহলে রামায়ণের গল্পই নেই! কারখানার মালিকের, সরকারের তরফে যে নজরদারি দরকার সেটা নিয়ে বলবে কে? প্রশাসনের তরফে দায় ঝেড়ে ফেললেই বিবেক পরিষ্কার। তারপর এই কারখানা আবার ফুল মালিকের। যে ফুল আর নার্সারি দেখে আমরা উদ্বেলিত হই। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মঞ্চে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, যেমন বিবাহ, শ্রাদ্ধে ফুলের চাহিদা প্রবল। এই ফুলের সঙ্গে প্লাস্টিকের ফুল, কাপড়, কাঠ ইত্যাদি মিশেল দিয়ে পুষ্পবাসর সজ্জিত হয়। ফলে এই গুদামে এই অতিদাহ্য বস্তুগুলি থাকবেই। এগুলি জমিয়ে রাখতে হয় কারণ এসব পুনর্ব্যবহারযোগ্য।
ফুলের গন্ধে শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত
গতকাল প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক সভায় হেভিওয়েটের মঞ্চে যে গেরুয়া গাঁদা অগ্রাধিকার পেয়েছে, পরদিন ঘাসফুলে সে একটু পিছিয়ে থেকে অর্কিড ও গোলাপকে এগিয়ে দেবে। গতকাল টুলুদেবীর শ্রাদ্ধবাসরে যে শুভ্র প্লাস্টিক পুষ্পগুচ্ছ, পরদিন ‘অনুরাগ ওয়েডস দীপিকা’-র নতুন জীবনের প্রবেশদ্বারে সে শোভা পাবে। নিত্য চলনশীল এই নার্সারি ব্যবসায় এত লাভ হবে যে একটা বিএড কলেজ, আরও কিছু প্রতিষ্ঠান অনায়াসে তৈরি হয়ে যাবে। কে বলে ফুলের দাম নেই? গঙ্গাধররা নার্সারি করে গোডাউন বানায়। সেই গোডাউনে অন্তিমসজ্জার উপযোগী দাহ্যবস্তু এসে জমা হয়। তার পাশের গোডাউন সে ভাড়া দেয় খ্যাতনামা কোম্পানিকে যারা এক তিব্বতি খাদ্যকে ভাজা পোড়া দলামোচড়ায় কিম্ভূত বানায়। যার মহার্ঘ মূল্য শুনে আপনার মুখ থেকে ‘ওয়াও’ শব্দ বেরিয়ে যাবেই। এরা গোডাউনে শ্রমিক রাখে। বলা যায়, এমন ব্যবসায় সবাই রাখে। সেখানে শ্রমিকরা কী করছে সে বিষয়ে কোনও খবর না রেখে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দিলে সব সমস্যার সমাধান হয়। নার্সারি মালিক বড় বরাত পায় ফুলসজ্জার। সেই ফুল সাজাতে গ্রাম থেকে শ্রমিকরা আসে। তাদের পরিবার জানে- তারা ইট বানায় না, বালি তোলে না, গরম পিচ ঢালে না, উদোম রোদে মাটি কাটতে যায় না, তারা তুলনায় নিরাপদ কাজ করতে গেছে। তারা মণ্ডপে ফুল সাজায়। ফুল অতি পবিত্র, নরম বস্তু। সে বড় মনোরম, মৃদু ও সর্বজন প্রিয়। সেই ফুলের কাজ শেষ করার পর এরা দল বেঁধে মাল রাখার গুদামে আরও কয়েকটি মালের মতো দলা পাকিয়ে থাকে। এক কিস্তি টাকা পাওয়ার পর হইচই করে রান্না করে খায়। শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা, অসংগঠিত ক্ষেত্রে সোনার পাথরবাটির মতো কাল্পনিক, এ কে না জানে?
শ্রম আইনের প্রহসন ও মালিকি শাসন
এখন ঘরে ঘরে কাজ করা মহিলাদের অধিকার ও সম্মান এঁদের চেয়ে বেশি। এঁদের নাম হরিপদ দাস, আকাশ সূত্রধর, বিনয় চক্রবর্তী, বিজন সামন্ত যা কিছু হতে পারে। এঁরা কতজন খাটতে আসছেন এবং বাসযোগ্য ঘর আছে কি না সে বিষয়ে মালিকের কাছে কোনও খবর থাকে না। একের বদলে অন্যে কাজ করছে কি না, তাও জানে না ঠিকাদার বা নিয়োজক সংস্থা। শ্রম আইন ওই খাতার কলমের অধিকার, যেমনটা আমরা গাছেদের প্রাণ আছে, এ বিষয়টা নিয়ে ভাবি। এ বৃক্ষ লতার মতোই যারা ভয়েসলেস তারা মনুষ্য বাসযোগ্য কোনও থাকার ঘর পাবে না এটাই স্বাভাবিক। যদি বাইরে থেকে তালাবন্ধ না করে তারা ভিতর থেকেও বন্ধ করে ঘুমোয়, যদি হাতে খানিক টাকা এসে যাওয়ায় খাওয়াদাওয়া বেশি হয়েও থাকে, ঢোকা-বেরোনোর দরজা তো একটাই। সামনে যখন আগুন জ্বলছে তারা বেরোবে কোথা থেকে?
দগ্ধ শরীর এবং বিচারহীনতার অন্ধকার
এই যে বদ্ধ মালঘর, সেটা জতুগৃহে পরিণত হওয়ার জন্য দরকার একটি স্ফুলিঙ্গের। তা শর্টসার্কিট থেকে হতে পারে, দেশলাই কাঠি বা লাইটারও হতে পারে। এই শ্রমিকদের হাতে স্মার্টফোন আছে। তারা যখন দেখছে লেলিহান শিখা আর দম বন্ধ গ্যাস এগিয়ে আসছে সাক্ষাৎ মৃত্যু রূপে, তারা ফোনে বলছে পরিজনকে। মাকে, বাবাকে, স্ত্রীকে, সন্তানকে। অপরপ্রান্তে যারা আছে তারা বেঁচে যাবে, তাই তারা অভিশপ্ত। যারা অসহায়ভাবে পুড়ে কাঠকয়লা হচ্ছে, স্রেফ তালা লাগানো বলে- মৃত্যুর প্রহর গুনছে। এই তালার চাবি কোনওদিন প্রান্তিকের হাতে, অপরের হাতে পৌঁছায় না। এরা স্রেফ তন্দুরে ঝলসানো শুয়োর বা মুরগির মতো পুড়ছে। পুড়ছে তো আমাদের কী? আমরা এক ডাক্তার ছাত্রীর জন্যে মাঠঘাট এক করে বুঝেছি, ক্ষমতার কাছে মাথা খোঁড়াই সার। তার মন বলে কিছু নেই। তার ওপর এই লোকগুলো আমাদের মনের দরজার বাইরে কতগুলো সংখ্যা মাত্র। আমরা আর কেন ওই লোকগুলোর জন্য বিচার চাইব? চিরকাল সেই মহেন-জো-দারো, হরপ্পার বড় বাড়িগুলোর বাইরে ছোট বাড়িগুলো থাকে, থেকে যায়। নগর বাহিরে থাকে পৃথিবীর সব ছোট-লোক। তালা ঝুলিয়ে আমার বাড়িতে তাদের প্রবেশাধিকার রোধ করেছি, তালা বন্ধ করে বাইরের আলো, হাওয়া, প্রকৃতির ধোপা নাপিত আটকেছি। তাই আজ তারা কয়েকটা হাড়গোড় হয়ে অন্ধকূপে পড়ে থাকলে কি যায় আসে আমার, আমাদের?
(লেখক সাহিত্যিক)

