অমানবিকতার ভিড়েও মানবিকতার আশা

শেষ আপডেট:

অজিত ঘোষ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, মানবতার (Humanity) সেবাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। সেই বিশ্বাসেই বর্ধমান মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী পরীক্ষার তাগিদে টিকিট ছাড়াই ট্রেনে উঠেছিলেন। কিন্তু টিকিট পরীক্ষকের কঠোর ও অনমনীয় অবস্থানে দীর্ঘ হেনস্তার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। অমানবিক এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই স্মরণে আসে কালিয়াগঞ্জের মোস্তাফানগরের সেই অভিশপ্ত দিনটির কথা। ন্যায্য অ্যাম্বুল্যান্সভাড়ার দ্বিগুণ দাবি মেটাতে না পেরে এক অসহায় বাবাকে তাঁর মৃত পাঁচ মাসের শিশুর দেহ চাদরে মুড়িয়ে বাজারের ব্যাগে করে ২০০ কিলোমিটার পথ বাসে বহন করতে হয়েছিল। এই দুই ঘটনা আমাদের সিস্টেমের কাঠিন্য এবং মানবিক বোধের চরম অভাবকে সমাজের দোরগোড়ায় নিয়ে আসে, যা আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে বিচলিত করে।

অমানবিকতার এই করাল গ্রাস থেকে রেহাই পায়নি নিষ্পাপ শিশুরাও। বালুরঘাটের (Balurghat) ছয় বছর বয়সি এক শিশুর বস্তাবন্দি লাশ তিনদিন পর প্রতিবেশীর টালির চাল থেকে উদ্ধার হওয়ার ঘটনা পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দেয়। পরিবারের মুখে শোনা যায় সেই চিরন্তন আক্ষেপ, ‘এমন অমানবিক প্রতিবেশী যেন কারও না হয়।’ আমরা প্রতিদিন এমন নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হয়েও মুখ ফিরিয়ে অন্য পথ ধরি। মূলত ‘অমানবিক’ শব্দটি অভিধানের পাতায় কেবল একটি শব্দমাত্র নয়, বরং আমাদের উদাসীনতা ও স্বার্থপরতাকেই প্রতিনিয়ত সেই শব্দের আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছি। মানুষ আজ নিজের স্বার্থ আর ভয়ের বৃত্তে বন্দি হয়ে অনেকটা আবেগহীন যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে।

বর্তমানে আমাদের জীবন যেন এক অশুভ ‘প্লে-স্টেশন’ গেম হয়ে উঠেছে, যেখানে অন্যকে হারিয়ে বা অন্যের ক্ষতি করেই জয়ী হওয়া যায়। মেধাবীর স্বপ্ন চুরমার হওয়া বা গরিবের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেওয়া—সবই যেন এক পরিকল্পিত রাজনীতির অংশ। আবাস যোজনার ঘর থেকে শুরু করে ডাবল চাকরির প্রতিশ্রুতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ যখন সুযোগ খোঁজে, তখন সমাজনীতি থেকে রাজনীতি হয়ে ওঠে চরম অমানবিক। নামী গায়কের ভাষায়, এটি যেন এক নিষ্ঠুর গেম, যেখানে মানুষের আবেগ বা প্রয়োজন কেবলই সংখ্যায় রূপ পায় এবং সাধারণ মানুষ কেবল ভাতার লাইনে দাঁড়ানোর মাধ্যম হয়ে ওঠে।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ফড়িং বা দোয়েলের জীবনের যে সরলতা ফুটে উঠেছে, তার সঙ্গে মানুষের জীবনের কোনও মিল নেই। প্রকৃতির জীবনে ক্লান্তি বা উদ্দেশ্যহীন হাহাকার নেই, কারণ তা অকৃত্রিম ও শুদ্ধ। অন্যদিকে, মানুষ তার অমানবিক কর্মকাণ্ডের কারণেই জীবনকে জটিল ও দ্বন্দ্বময় করে তুলেছে। জীবনযাত্রার এই অস্থিরতাই মানুষকে বাধ্য করছে গভীর হতাশায় ডুবতে, যা শেষ পর্যন্ত আত্মহননের মতো পথ দেখাতে প্ররোচিত করে। এই জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে হলে মানবিক বোধের পুনর্জাগরণ অনিবার্য।

এত অন্ধকারের মাঝেও রিক বাগদি কিংবা রবীন্দ্রনাথ মণ্ডলের মতো মানুষরা প্রমাণ করেন মানবিকতা আজও ফুরিয়ে যায়নি। কাঁথি মহকুমা হাসপাতালের আইসিইউ টেকনিসিয়ান রবীন্দ্রনাথ মণ্ডলের অদম্য চেষ্টায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা কিশোরী কিংবা ১৬ মাসের শিশু অস্মিকা দাসের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় গড়ে ওঠা মানবিক সহায়তার ষোলো কোটির ইনজেকশন—এগুলোই আমাদের বেঁচে থাকার রসদ। অমানবিকতার এই দীর্ঘ ছায়ায় মানবিকতা আজও এক প্রদীপের মতো জ্বলে আছে। দিনশেষে দু’মুঠো অন্নের মতো মানবিকতা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। কারণ, আশার আলোকে পৃথিবীর কোনও অন্ধকারই চিরতরে মুছে দিতে পারে না।

(লেখক অক্ষরকর্মী। গঙ্গারামপুরের বাসিন্দা।)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

শ্রীখোল ছাপিয়ে ডিজে কীর্তনের দাপট

মলয় চক্রবর্তী বাঙালির মজ্জায় মিশে থাকা যে কীর্তনের সুর একদিন...

বিচ্ছিন্নতার দায় কি শুধুই উত্তর-পূর্বের?

নীহারিকা সরকার আমাদের তথাকথিত ‘মূলস্রোতের’ ভারতীয়দের একটা অদ্ভুত এবং দুরারোগ্য...

উত্তরে কমিউনিস্টদের প্রথম মুখরক্ষা 

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি উত্তরবঙ্গের তিনটি...

মহিলা সংরক্ষণ ও রাজনীতির চাল

ডিলিমিটেশন ও মহিলা সংরক্ষণ বিলকে এক সূত্রে গেঁথে রাজনৈতিক...