বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬

দেবতারে মোরা আত্মীয় জানি

শেষ আপডেট:

 

  • অনমিত্র বিশ্বাস

‘দেবতারে মোরা আত্মীয় জানি-,’ এমনটাই বলে কবি সত্যেন দত্ত ছন্দঝংকারে কীর্তিত করেছিলেন কোন প্রাগিতিহাসের যুগে রামের প্রপিতামহের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে হালে মহাপ্রভু বা বীর সন্ন্যাসী বিবেকের আবিশ্ব খ্যাতি। যে বাঙালি দিগ্বিজয়ী ‘সিংহল’ নামে স্ব-কীর্তির সাক্ষর রেখেছিলেন, যে বাঙালি দীপঙ্কর সুদূর তিব্বতে জ্বেলেছিলেন জ্ঞান ও সদ্ধর্মের দীপ, শ্যাম কাম্বোজে ওঙ্কার-ধামের ভাস্কর্য-নির্মাণ করেছিলেন সেই স্থপতি রূপদক্ষরা- কবি তাঁদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত বোধ করেছেন। সফল স্বদেশবাসীর জন্য গর্ব বোধ করা-ই স্বাভাবিক, সহজ।

কুয়ালা লামপুরের সেন্ট্রাল মার্কেটের কাছে একটা ছোট নাসি কন্দর বা ভাতের হোটেলে কাজ করত আজিজ। দেড় দশক আগে। আমরা যে এক মাস ছিলাম, প্রায় রোজই সেখানে খেতে যেতাম। আজিজ আমাদের টেবিলে এসে তার ফাঁকা সময়টুকু কথা বলে যেত। আমাদের কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না বিদেশে, কলকাতার কোথায় আমরা থাকি, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে কতদূরে ইত্যাদি জানতে চাইত। ও ছিল বাংলাদেশের কোনও এক জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। সে তার বাড়ির কথা বলত, তার ছোট বোনের গল্প করত- প্রবাসে যার কথা তার বারবার মনে পড়ত। উপার্জনের প্রলোভনে সে কোনও এজেন্টের সঙ্গে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল সমস্ত সঞ্চয়টুকু খুইয়ে, সেই স্বপ্ন তার ভেঙে গেছে। তবু এখানকার রিঙ্গিতের প্রাইস ইন্ডেক্স বাংলাদেশের টাকার চেয়ে অনেক বেশি। তবুও স্বপ্ন দেখত, সে যতটা সম্ভব টাকা জমাবে, তারপরে দেশে ফিরে যাবে কোনওদিন। বোনের ধুমধাম করে বিয়ে দেবে ভালো ঘরে, বাবা-মায়ের জন্য সচ্ছলতা ও সেবাযত্নের ব্যবস্থা করবে সে। সঙ্গীহীন নির্বাসনে আজিজের ঘোলাটে চোখে যে স্বপ্নগুলো ছিল, তার সবটা আমরা ঠিকঠাক ধরতে পারিনি।

নাসি কন্দরের পিছনে একটা ঘুপচি ঘরে- তেতলা খাটের বাংকে শুত রাতে কয়েক ঘণ্টা। বাকি সময়টায় তার কাজের থেকে ফুরসত কোথায়? আজিজ ই-মেল পাঠাতে জানত না। আন্তর্জাতিক দূরভাষের খরচ তার জন্য দুঃসাধ্য। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ ছ’মাসে-ন’মাসে। অথচ সে নিজেকে ক্ষয় করে চলেছিল সামান্য এক চিলতে স্বপ্ন নিয়ে। তার ইমিগ্রেশন সম্পূর্ণ আইনত হয়নি, আর তা নিয়ে তার খুবই দুশ্চিন্তা ছিল।

পিনাঙে এক উত্তর ভারতীয় রেস্তোরাঁয় দেখা হয়েছিল দিল্লির দীনেশের সঙ্গে। ভাঙা হিন্দি সম্বল করে আমরা তার সঙ্গে কথা বলতুম, সে আমাকে আর আমার বোনকে নানারকম হাতসাফাইয়ের খেলা দেখাত। সে-ও আজিজের মতোই নিঃসঙ্গ, প্রবাসী। তবু পিনাঙের ওদিকটায় বেশ কিছু ভারতীয় আছেন। তাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে মালয়বাসী তামিল হিন্দু। কৃষ্ণ-মন্দিরে সে প্রায়ই সন্ধ্যা আরতির সময়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে যেত। কিন্তু বাড়ির কথা তার মনে পড়ত সব সময়। সে এই নির্বাসন শেষে বাড়ি ফেরার পরে দিল্লিতে তার বাড়িতে আমাদের নেমন্তন্ন করে রেখেছিল।

শরদিন্দু বলেছিলেন, ‘মাতৃভূমি বলিয়া কোনো বিশেষ ভূখণ্ড নাই। মানুষের সহজাত সংস্কৃতির কেন্দ্র যেখানে, মাতৃভূমিও সেইখানে।’ নিশ্চয়ই সেই সংস্কৃতি ধর্ম-সর্বস্ব নয়। ফিরে আসবার আগের দিন আমাদের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছিল, আমরা কেবল এয়ারপোর্টে যাবার পথে আজিজের সঙ্গে দেখা করতেই সেন্ট্রাল মার্কেটে নেমেছিলাম মেট্রো থেকে। আজিজ অবাক হয়ে বলেছিল, ‘তোমরা শুধু আমার সঙ্গে দেখা করতে এতদূর এসেছ?’ সে জোর করে আমাদের হাতে কয়েকটা গার্লিক নান ধরিয়ে দেয় পথে খেতে খেতে যাবার জন্য, তার নিজের খরচে। আজিজের কাছে ওই-ক’টা টাকারও কত গুরুত্ব তা আমরা জানতাম।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল পুরস্কার নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাতামাতি করেছে, যেন কৃতিত্ব তাদেরই। টালিগঞ্জের কনিষ্ঠতম টেকনিসিয়ান যখন সাবলীল কণ্ঠে সত্যজিৎ রায়কে ‘মানিকদা’ বলে উল্লেখ করে, তখন সেটা হাস্যকর লাগলেও বুঝি যে গর্ব করবার মতো এই এক-দুজন মানুষকে যতটা সম্ভব আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় গরিব দেশের বাকিরা। আজ জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হবার পর ভারতবর্ষের নাগরিকদের একাংশ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে, বিশেষত যাদের সঙ্গে মামদানির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মেলে। কেউ কেউ আবার সেই আত্মীয়তার জেরে মামদানিকে ‘গুজরাটি’ বলে উল্লেখ করছেন। মামদানি নিজে আমি যতদূর শুনেছি ভারতীয় বলে আত্মপরিচয় দেন না। তাঁর মা ভারতীয় হলেও বাবা গুজরাটের খোজা মুসলিম বংশোদ্ভূত উগান্ডান। মামদানি উগান্ডা ও আমেরিকার দ্বৈত নাগরিক, এমনকি তাঁর নামের মুসলিম অংশটুকু বাদে একটা উগান্ডান মিডল নেমও আছে।

জনসাধারণের আবেগ এই চুলচেরা বিচারের ধার ধারে না। যুক্তরাজ্যে ঋষি সুনক নির্বাচিত হবার পরে বহু ভারতীয় উল্লসিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বেশ প্রত্যুত্তর হয়েছে বলে ধরে নিয়েছিলেন। যে বিষয়ে আমি গবেষণা করি, তাতে বহু ভারতীয় নাম দেখি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যদিকে, গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে পরিচয়হীন এমন কত ভারতীয় শ্রমিক- যারা কোনওদিন অস্কার পাবে না, অ্যাবেল প্রাইজ পাবে না। তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে ছাই দিয়ে প্রথম বিশ্বের রাজনৈতিক কুর্সিতে বসবে না। সুকান্তর ‘রানার’-এর মতো তারা স্বীকৃতিহীন, জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে ঘাম-রক্ত ঝরিয়ে স্বপ্ন দেখছে মিলনান্তিক ভবিষ্যতের- যে ভবিষ্যৎটা ইতিহাস বা অর্থনীতির দিক থেকে অকিঞ্চিৎকর হলেও তার জন্য মরণপণ সাধনা।

নিউ ইয়র্কের মেয়র হবার উচ্চাভিলাষের জন্য যে অধিগম্যতার ডাইভিং বোর্ড থেকে ঝাঁপ দিতে হয়, তা এই অধিকাংশ ভারত-উদ্ভূত ছেলেমেয়ের পক্ষে কল্পনার অতীত। জীবনযুদ্ধের প্রতিপক্ষ হয়ে যে অদৃশ্য ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি তাদের প্রত্যেকটা উপার্জনের মূল্য বুঝে নেন জীবনীশক্তির সঙ্গে দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে। ‘মামদানি বিরল সৌভাগ্যবানও বটে। তাঁর বাবা অধ্যাপক ও রাজনীতি-বিশেষজ্ঞ, মা চিত্র পরিচালিকা। মোটের ওপর, তৃতীয় বিশ্বের ঐতিহ্যের ময়ূরপুচ্ছটি মামদানি পেয়েছেন, তাঁর রিক্তহস্ত সংঘর্ষের উত্তরাধিকার নয়। মামদানি নিজগুণে অর্জন করেছেন যে সাফল্য, তাকে এতটুকু অস্বীকার না করেই বলছি, মার্কিন মুল্লুকের মাপদণ্ডেও সচ্ছলতম পারিবারিক পরিকাঠামো তিনি পেয়েছিলেন।

ভারতবর্ষের প্রবাসী যেসব ছেলেমেয়ে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায়নি, উন্নাসিক অভিভাবকের সাহচর্যে বড় হয়নি, তাদের পক্ষে এই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর স্বপ্ন দুঃসাধ্য। কিন্তু যে নিঃসম্বল ছেলেটা যথেষ্ট টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে পরিবারের হাল ধরার মতো অগৌরবের ‘নন-ইন্টেলেকচুয়াল’ উদ্দেশ্যে বিদেশের মাটিতে সূর্যোদয় থেকে মাঝরাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে, সাধ্যের মাত্রার কানায় কানায়- তাকেও আমি শ্রদ্ধা করি। ভারতীয় হিসাবে, জোহরান মামদানির চেয়ে দিল্লির সেই দীনেশ- আর তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশের আজিজ নামক ছেলেটার জন্য আমি অনেক বেশি গর্ব অনুভব করি।

(লেখক আইআইটি ভিলাইতে অঙ্কের গবেষক)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

নম্বরের ইঁদুর দৌড়ে হারছে জীবন

 সাহানুর হক‘মাধ্যমিক’- শব্দটা শুনলেই কিশোর মনে একসঙ্গে ভিড়...

প্রকৃতি–চিন্তার অদৃশ্য এক নায়ক  

 সেবন্তী ঘোষআমরা কি কাঁচাবাদাম কাকুকে চিনি? অবশ্যই। ক’দিন...

পিঠেপুলির গন্ধে উত্তরবঙ্গের নস্টালজিয়া

 মনোমিতা চক্রবর্তীপৌষের শেষ দিন মানেই হাড়কাঁপানো শীত আর...

ডাক্তারিতেও কি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দশা?

 আবীরলাল মণ্ডলপদের তুলনায় সাতগুণ আবেদন! সংখ্যাটা শুনলে চোখ...