বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫

Gold Trader Murder Case | খুনের নেপথ্যে সোনার কালো কারবার

শেষ আপডেট:

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: চুরি যাওয়া সোনা, একটি খুন, রহস্যময় নীলবাতি লাগানো গাড়ি এবং একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী আমলা-ক্রাইম থ্রিলার বলতে যা বোঝায় তার যাবতীয় রসদই রয়েছে সল্টলেকের স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা হত্যাকাণ্ডে (Gold Trader Murder Case)। তবে গোয়েন্দারা বলছেন, গল্প অত সরল নয়। এই থ্রিলারে রয়েছে এখনও অপ্রকাশিত আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাদের একজন কোচবিহারের প্রভাবশালী এক তৃণমূল নেতা এবং অন্যজন তার গাড়ির চালক। ওই চালকই অন্ধকারাচ্ছন্ন কাহিনীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। আপাতত পলাতক ওই চালককে ধরতেই জাল গোটাচ্ছেন তদন্তকারীরা।

সামান্য কিছু অলংকার বা কয়েক গ্রাম সোনা নয়, স্বপনের অপহরণ ও খুনের ঘটনার তদন্ত ক্রমেই এগোচ্ছে বড় অপরাধচক্রের এক অন্ধকার জগতের দিকে। ঘটনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সোনা পাচারচক্রের যোগসূত্র রয়েছে বলেই মনে করছেন গোয়েন্দারা। তাদের ধারণা, গোটা ঘটনায় বারবার যে ‘চুরি যাওয়া সোনা’-র কথা উঠছে সেই সোনা আসলে পাচারচক্রের সোনা এবং তার পরিমাণ এতটাই বেশি, যা হাতছাড়া হওয়ায় কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছিল চক্রের কারবারিরা। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, চোরের ওপর বাটপাড়ি করত কালো কারবারিরা। নানা কায়দায় পাচারকারীদের কাছ থেকেই সোনা লুট করত তারা।  তদন্তকারীরা মনে করছেন, সোনা চক্রের সঙ্গে একাধিক প্রভাবশালী মাথা জড়িত এবং তাদের সঙ্গে স্বপনের পূর্ব পরিচয় ছিল। স্বপনের সূত্র ধরেই আরও দুজন ছোট স্বর্ণ ব্যবসায়ীর খোঁজ শুরু হয়েছে, যারা চক্রের হয়ে সোনা গলানো এবং বিভিন্ন গোপন ঠিকানায় সেগুলো পৌঁছে দেওয়ার কাজ করত।

একটি নয়, খুনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিউটাউনের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেই জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। সেই ফ্ল্যাটের একটি প্রভাবশালী আমলার, অন্যটি তৃণমূল নেতার। কলকাতা থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে উত্তরবঙ্গে অনেক আগেই জুটি বেঁধেছিলেন ওই আমলা এবং নেতা। যাকে বলা যেতে পারে রাজযোটক। গোয়ান্দারা বলছেন, এর আগেও একের পর এক অপকর্ম করেছে ওই সিন্ডিকেট। প্রশাসনিক ক্ষমতার ছাতার তলায় গড়ে ওঠা ভয়ংকর ওই নেটওয়ার্কের মাথায় রয়েছে কলকাতা ও দিল্লির একাধিক অদৃশ্য হাত। তাই বুঝেশুনে পা ফেলতে চাইছেন গোয়ান্দারা।

খুনের নেপথ্যে কয়েক কোটি টাকার সোনা গায়েবের গন্ধ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। সেই গন্ধ শুঁকেই নিউটাউন থেকে দিনতিনেক আগেই কোচবিহারে পৌঁছেছে গোয়েন্দারের বিশেষ দল। কালো কারবারের অন্যতম শাগরেদ তৃণমূল নেতার গাড়ির চালককে পাকড়াও করতে চাইছেন তাঁরা। ওই চালকের বাড়ি পুণ্ডিবাড়ি এলাকায়। তিনদিনে বারছয়েক হানা দিয়েও তাকে ধরতে পারেননি গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, ছেলের খোঁজ পেতে শনিবার চালকের বাবাকে আটক করেছেন তাঁরা। বিপদ বুঝে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন চালকের মা। যদিও এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে চালকের বাবাকে আটক বা গ্রেপ্তার কিছুই দেখানো হয়নি। এমনই চুপিসারে গোয়েন্দা দল কাজ সেরেছেন যে, চালকের প্রতিবেশীরা ঘুণাক্ষরেও তা টের পাননি। গোয়েন্দারা মনে করছেন ওই চালকই সোনার কালো কারবারের প্রাণভোমরা। তাকে বাগে পেলেই অসল রহস্য ভেদ হবে।

প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার বাড়িও পুণ্ডিবাড়ি এলাকাতেই। ব্লকে শাসকদলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও আছেন তিনি। গোয়েন্দাদের নজর পড়েছে নেতার ভাইদের ওপরেও। নেতার গুণধর দুই ভাইয়ের নামে আগেই নানা অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ রয়েছে। সোনা কারবারে সেই ভ্রাতৃদ্বয়ের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর, বিপদ আঁচ করে অবশ্য ইতিমধ্যেই গা-ঢাকা দিয়েছে দুজনেই। নেতাও দিনদুয়েক হল নিজেকে আবডালেই রেখেছেন।

তদন্তকারীরা প্রভাবশালী আমলার অপরাধের বেশকিছু ইতিহাসের নথিও জোগাড় করে ফেলেছেন। শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের ভোরের আলো থানায় আমলার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কার্যকলাপের নথি মিলেছে। শিলিগুড়ি থেকে জলপাইগুড়ি যাওয়ার জাতীয় সড়কে এক বস্ত্র ব্যবসায়ীকে মারধর করে লুটের ঘটনাতেও আমলার যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। আমলার এলাকাভিত্তিক নিজস্ব গুন্ডাবাহিনীরও খোঁজ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। কোন এলাকায় কারা ওই আমলার হয়ে কাজ করত তার তালিকাও তৈরি শুরু হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে আলিপুরদুয়ারের কাছে অসমগামী জাতীয় সড়কে পাচারের সোনা লুটের একটি খবরও গোয়েন্দাদের কানে এসেছে। যদিও সেটা সত্যি না মিথ্যা সে সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি তাঁরা।

বিভিন্ন সময় অপরাধচক্রের ব্যবহৃত মোট পাঁচটি মোটরবাইক এবং চারটি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করে নিজেদের হেপাজতে নিতে তৎপর হয়েছেন তদন্তকারীরা। সেই গাড়িগুলোর খোঁজ শুরু হয়েছে। দুটি বাইক এবং একটি গাড়ি শিলিগুড়ির শিবমন্দির এলাকায়, অন্য একটি গাড়ি পুণ্ডিবাড়ির পরেশ কর চৌপথি এলাকায় দেখা গিয়েছে। আমলা ও নেতার অন্ধকার জগতে আলো ফেলতে শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। ওপরমহলের চাপে মাঝপথে তদন্ত বন্ধ না হলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডে দুজনেই মহাবিপাকে পড়তে পারেন বলেই মনে করছেন পুলিশের মাঝারি কর্তারা।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

More like this
Related

Falakata Municipality | বড়দিনে ‘বড়’ উপহার ফালাকাটার, সাড়ে ১০ কোটিতে ২১৩টি কাজ পুরসভার

ভাস্কর শর্মা, ফালাকাটা: ফালাকাটার নাগরিকদের বড়দিনের উপহার দিল পুরসভা।...

Deshbandhu Para Shris Ch. Primary School | পড়ুয়া মাত্র ১৭, ধুঁকছে শ্রীশ চন্দ্র প্রাথমিক স্কুল

ভাস্কর শর্মা, ফালাকাটা: প্রতিষ্ঠার পর কেটে গিয়েছে ৫৩ বছর।...

Tufanganj hospital | রোগীর পাশে কুকুর-বিড়াল, উদাসীনতার ছবি তুফানগঞ্জ হাসপাতালে

বাবাই দাস, তুফানগঞ্জ: রোগীর বেডের নীচে তিড়িংবিড়িং করে ঘুরে...

Cooch Behar Bhavan | কোচবিহার ভবনের ভাড়ায় চক্ষু চড়কগাছ

গৌরহরি দাস, কোচবিহার: কলকাতার সল্টলেকে থাকা কোচবিহার ভবনের (Cooch...