পাকিস্তান বরাবরই ভারতবিরোধী। কিন্তু বাংলাদেশ যে কোনওদিন ঘোর ভারতবিরোধী হয়ে যাবে, কেউ কখনও ভাবতে পেরেছিলেন? পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে ইন্দিরা-মুজিব সখ্যের সৌজন্যে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে গড়ে ওঠা সৌভ্রাতৃত্ব নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও এই সেদিন পর্যন্ত ছিল নিরবচ্ছিন্ন। সদ্য তাতে বিঘ্ন ঘটেছে।
বাংলাদেশে তাণ্ডব চলছে মৌলবাদীদের। হিন্দুদের মেরে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনও ভারতীয় সেদেশে নিজের নাগরিকত্বের পরিচয় দিতে ভয় পাচ্ছেন। ভয় পাচ্ছেন হিন্দু বলে পরিচয় দিতে। পরিস্থিতি এত ঘোরালো হয়েছে ২০২৪-এর ৫ অগাস্ট প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার থেকে।
মাঝে কিছুদিন বিএনপি’র শাসন থাকলেও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে হাসিনার দল আওয়ামী লিগ ছিল ভারতের বড় ভরসা। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সেই আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ করেছেন। ফলে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনও সুযোগ আর নেই।
আওয়ামী লিগের সভাসমাবেশ সহ যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যকলাপ, এমনকি ফেসবুকের মতো সমাজমাধ্যমে প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বাংলাদেশ সরকার। ফলে সেদেশে আওয়ামী লিগের মতো একনিষ্ঠ ভারতবন্ধু বলতে এই মুহূর্তে আর কোনও রাজনৈতিক দল নেই। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) জমানায় ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক ছিল চলনসই। তবে সেটা কখনও হাসিনা জমানার মতো নয়।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বেশ কিছুকাল ধরে সংকটজনক। এই পরিস্থিতিতে খালেদা-পুত্র তথা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসন কাটিয়ে সদ্য ঢাকা ফিরেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজের প্রভাব খাটিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সবক’টি মামলা প্রত্যাহার করিয়েছেন।
বিভিন্ন জনমত সমীক্ষায় আভাস মিলছে, এই মুহূর্তে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি’র জয় একরকম সুনিশ্চিতই। এতদিন বিএনপি’র বাঁধাধরা জোটসঙ্গী ছিল জামায়াতে ইসলামি। কিন্তু এবারের ভোটে কট্টর মৌলবাদী জামায়াতের হাত ছেড়ে নিজের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে খালেদা জিয়ার দল। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট হবে ‘জুলাই সনদ’-এরও।
ইতিমধ্যে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামি- দুই দলের প্রার্থী বাছাইপর্ব মোটামুটি চূড়ান্ত। তবে এখনও পর্যন্ত জোট চিত্র খুব পরিষ্কার নয়। কিন্তু সম্ভাব্য তিন জোটের তৎপরতা লক্ষণীয়। প্রথমত, জামায়াতে ইসলামির নেতৃত্বে ধর্মভিত্তিক আট দলের জোট। দ্বিতীয়ত, বিএনপি’র নেতৃত্বে গণ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী কয়েকটি দলের জোট। তৃতীয়ত, গণ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অন্য কয়েকটি দল। তবে এই দলগুলির মধ্যে এনসিপি এখন জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে জোটের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, গণ অধিকার পরিষদের মতো দলের বিএনপি ঘনিষ্ঠতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামি অবশ্য বিএনপিকে পুরোনো জোটসঙ্গী সম্বোধন করে তারেকের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের চোখে বেগম খালেদার দল বিএনপি মন্দের ভালো। কেননা, আওয়ামী লিগের অবর্তমানে বিএনপি এখন সব ধর্মের মানুষের স্বার্থ রক্ষার বার্তা দিচ্ছে।
দেশে ফিরে তারেকের মুখে সেই বার্তা শোনা গিয়েছে। ভারতের বিদেশমন্ত্রকের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট বিএনপি’র কার্যকলাপের প্রতি নজর রেখে চলছে নয়াদিল্লি। অন্যদিকে, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির প্রবল বিক্ষোভ সত্ত্বেও ভারতের সর্বত্র বাংলাদেশের দূতাবাস ও উপ-দূতাবাসগুলিকে সুরক্ষিত রাখতে সচেষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু গোটা বাংলাদেশে মৌলবাদীরা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে, তা খুব উদ্বেগজনক। এই অবস্থায় শেষপর্যন্ত তারেক মৌলবাদীদের দিকে ঝুঁকে পড়লে তা ভারতের পক্ষে যথেষ্ট বিড়ম্বনার হবে। কথায় আছে, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। বিএনপি যেন এখন ভারতের কাছে কানা মামা।



