বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে আর মাসখানেক বাকি। অথচ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি খুন হওয়ার পর থেকে সেদেশ এমন অশান্ত যে সাধারণ নির্বাচন করানো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে। হাদির হত্যাকাণ্ডের পর এখনও পর্যন্ত হামলায় নিহত হয়েছেন ছয় থেকে সাতজন হিন্দু। হিন্দু নিপীড়ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমশ খারাপ হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক (India-Bangladesh Relation)। এর মধ্যে আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) (KKR) নির্ভরযোগ্য বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে (Mustafizur Rahman) ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) (BCCI) দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে।
বিসিসিআইয়ের নির্দেশে কোনও কারণ দেখানো হয়নি বটে, কিন্তু বিভিন্ন মহল প্রায় নিশ্চিত যে, কেন্দ্রীয় সরকারের ফরমানে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বিসিসিআইকে। অথচ বিসিসিআই স্বশাসিত সংস্থা। কেন্দ্রীয় সরকারের অঙ্গুলিহেলনে চলার কথা নয়। অন্যদিকে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বলতে না বলতে কেকেআর কর্তৃপক্ষ দ্রুত মুস্তাফিজুরকে টিম থেকে সরিয়ে দিল।
ক্ষুব্ধ, ব্যথিত, হতাশ মুস্তাফিজুর ভারতে আর কখনও খেলবেন না জানিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর প্রথম আইপিএলে খেলেছিলেন ২০১৬ সালে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে। তারপর খেলেন মুম্বই ইন্ডিয়ান্স, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু, চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে। কেকেআর ছেড়ে দেওয়ায় মুস্তাফিজুর এখন পাকিস্তান সুপার লিগে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কেকেআর মুস্তাফিজুরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভীষণ ক্ষুব্ধ। আসন্ন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে তিনটি ম্যাচ নির্ধারিত ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু বিসিবি ভারতে নিজ দেশের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার অভাবের যুক্তি দেখিয়ে বিসিসিআইকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ভারতে কোনও ম্যাচই খেলবে না।
কিছুদিন আগেও দুটো দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ঝামেলার প্রভাব খেলাধুলোর ওপর তেমনভাবে পড়ত না। বরং রাজনীতির তিক্ততা মুছে যেত খেলার মাঠে। দেখা যেত সৌজন্য ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ। আজ সম্পূর্ণ উলটো চিত্র। পহলগামে জঙ্গি হামলার পর গত বছর এশিয়া কাপে পাকিস্তানে কোনও ম্যাচ খেলবে না বলে ভারত সিদ্ধান্ত েনয়। তখন এশিয়া কাপ কর্তৃপক্ষ ম্যাচের স্থান ঠিক করল দুবাইয়ে।
দুবাইয়ে ক্রিকেট দুনিয়ায় বরাবরের হাই ভোল্টেজ ভারত-পাক ম্যাচ। বহু দশক ধরে ভারত-পাক ম্যাচকে কেন্দ্র করে উত্তেজনায় টগবগ করে ফোটে দুবাই। এবারও সেজে উঠেছিল মরুশহর। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ম্যাচ শেষে দু’দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে করমর্দনের সৌজন্যের ছবি দেখা গেল না। ভারত এবং পাকিস্তান পরস্পরের মাঠে ম্যাচ খেলবে না- এটা এতদিন চলছিল। এখন সঙ্গে যোগ হল বাংলাদেশ।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে, কোনও টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ চলতে থাকলে তো ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশা নেই। এমনিতেই ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটেই চলেছে। হাসিনা ভারতে আশ্রিতা। অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে চিঠি দিলেও দিল্লি তাতে সাড়া না দেওয়ায় বাংলাদেশ আরও ক্ষুব্ধ।
সম্প্রতি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরকে পাঠিয়েছিল ভারত। খালেদা-পুত্র ও বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে তাঁর হাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো চিঠি তুলে দেন জয়শংকর। দুজনের মধ্যে কথাও হয় বেশ কিছুক্ষণ। বাংলাদেশের নির্বাচনি আসরে আওয়ামী লিগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির দিকে ঝুঁকে ভারত কূটনৈতিক বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু মুস্তাফিজুরকে কেকেআর থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলল।

