- অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী
২০২৬-এর গোড়ার দিকে ভারতীয় অর্থনীতি নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে এক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সংস্থা। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেখানে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ভারত ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছোবে। তাও আবার নাকি গড়ে বার্ষিক ছ’শতাংশ বৃদ্ধির হার বজায় রেখে। আর্থিক বৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পাশাপাশি, বাড়বে মাথাপিছু গড় আয়ও। সংস্থাটির দাবি অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যেই চিন এবং আমেরিকার পরই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে ভারত। কারণ, চলতি অর্থবর্ষের শেষেই এ দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি পৌঁছোবে প্রায় ৪.১ থেকে ৪.৩ লক্ষ কোটি ডলারে। গত ১০ বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে ওই সংস্থা।
এ দেশের অর্থনীতির এহেন ‘অচ্ছে দিন’ আজ আর কেবল স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নয়। বঙ্গোপসাগর ক্রমেই এমন এক কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য— এই তিনটি স্বার্থ একসঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হল, ভারত কি এই সমুদ্রকে শুধুমাত্র নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখবে, নাকি এটিকে আগামীদিনের অর্থনৈতিক চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করবে?
ভারতের নীল অর্থনীতির নকশা
বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা পলিমেটালিক নোডুলস, গ্যাস হাইড্রেট ও বিরল খনিজ ভারতের জন্য সম্ভাব্য গেম চেঞ্জার বলে দাবি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। নবায়নযোগ্য শক্তি বা রিনিউয়েবল এনার্জি, বৈদ্যুতিক যান ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত এই খনিজের ওপর নির্ভরতা কমাতে, সমুদ্রভিত্তিক সম্পদ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। তবে এই সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, কূটনৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরকে উত্তর-পূর্ব ভারতের গেটওয়ে হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা অর্থনীতির মানচিত্র বদলে দিতে পারে। সমুদ্রবন্দর, মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি ও উপকূলীয় অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। এতে শুধু বাণিজ্যই বাড়বে না, দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বৈষম্যও কিছুটা লাঘব হতে পারে। তবে এই সমুদ্র শুধু সম্পদের নয়, আধিপত্যেরও ক্ষেত্র। ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার সহ উপকূলবর্তী দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়া বঙ্গোপসাগরে স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে চিনের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি ও অবকাঠামোগত আগ্রাসন এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে জটিল করে তুলছে।
তবে এতকিছুর মাঝে রয়েছে ভয়ংকর বিপদের আশঙ্কাও। ভারত আজ ‘নীল অর্থনীতি’-কে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরছে। বন্দর সম্প্রসারণ, গভীর সমুদ্র থেকে মাছ তোলা, সামুদ্রিক খনন, জাহাজ চলাচল ও উপকূলীয় শিল্পায়নের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরকে অর্থনৈতিক ইঞ্জিনে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল— এই উন্নয়নের মূল্য কে দিচ্ছে? বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী মৎস্যজীবী সমাজ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র কি এই নীল অর্থনীতির ভার বইতে পারবে?
মৎস্যজীবী ও প্রান্তিক সমাজ
বঙ্গোপসাগর ঘিরে গড়ে ওঠা মৎস্যজীবী সমাজ ভারতের প্রাচীনতম জীবিকানির্ভর জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। ছোট নৌকা নিয়ে প্রতিটি মরশুমে মাছ ধরা এবং প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁদের জীবন চলে। কিন্তু, নীল অর্থনীতির আওতায় গভীর সমুদ্রে বড় বাণিজ্যিক ট্রলার ও আধুনিক মাছ ধরার জাহাজের প্রবেশ এই ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছে। বড় ট্রলারগুলো অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ মাছ ধরে। ফলে, উপকূলবর্তী অঞ্চলে মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা আগের মতো আর মাছ পাচ্ছেন না। আয় কমছে, বাড়ছে দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা। অনেক ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হলেও উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের জন্য বিকল্প জীবিকার কোনও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে, গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ ও ট্রলারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা হচ্ছে অনেক সময়। ছোট নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জাল নষ্ট হচ্ছে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। অথচ, নীতিনির্ধারণের টেবিলে এই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর প্রায় অনুপস্থিত। নীল অর্থনীতি যদি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তবে তা প্রান্তিক সমাজের জন্য উন্নয়ন নয়, বরং বঞ্চনার নতুন নাম হয়ে উঠছে।
নীরবে হারিয়ে যাওয়া সম্পদ
বঙ্গোপসাগর শুধু অর্থনৈতিক সম্পদের আধার নয়, এটি এক সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। এখানে যেমন রয়েছে প্রবাল প্রাচীর তেমনই রয়েছে ডলফিন, সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং অসংখ্য বিরল মাছ ও উদ্ভিদের প্রজাতি। কিন্তু বন্দর নির্মাণ, সমুদ্রতল খনন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও শিল্পবর্জ্যের কারণে এই জীববৈচিত্র্য ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হওয়া মানে, পুরো সামুদ্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়া। প্রবাল মাছের প্রজনন ও আশ্রয়ের জন্য অপরিহার্য। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে মাছের সংখ্যা কমে যায়, যার প্রভাব সরাসরি মৎস্যজীবীদের জীবিকায় পড়ে। অন্যদিকে, ডলফিনের মতো প্রাণীদের, জাহাজের শব্দদূষণ ও সামুদ্রিক ট্রাফিকের কারণে স্বাভাবিক চলাচল ও যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়ছে। প্লাস্টিক দূষণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্লাস্টিক বর্জ্য, সমুদ্রে গিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হচ্ছে, যা মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে ঢুকে পড়ছে। শেষপর্যন্ত সেই দূষিত মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় আসছে। এই দূষণ শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। সমুদ্রে শুধু তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নয়, শিল্পবর্জ্যের জন্য এই মাক্রোপ্লাস্টিক ছড়াচ্ছে। এর ফলে, বহু ক্ষেত্রে বিষক্রিয়া ঘটছে সেখানে। ছোট ছোট অনেক মাছের মৃত্যু হচ্ছে। সঠিক পর্যবেক্ষণের অভাবে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, ওই মাছই তুলে নিয়ে ব্যবসা করছে। এর ফলে বাড়ছে নতুন বিপদের ঝুঁকি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা
নীল অর্থনীতির নামে অতি-শিল্পায়নের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও সুন্দরবনের ওপর। সুন্দরবন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এক প্রাকৃতিক ঢাল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সময় এই ম্যানগ্রোভ বন উপকূলকে রক্ষা করে। কিন্তু বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ম্যানগ্রোভ কেটে ফেলা হলে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এমনিতেই বাড়ছে; তার ওপর ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হলে উপকূলীয় গ্রাম ও জনবসতি আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। সুন্দরবনের ক্ষতি মানে শুধু একটি বনভূমির ক্ষতি নয়। এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার ক্ষতি। নীল অর্থনীতির পরিকল্পনায় যদি এই বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়, তবে ভবিষ্যতে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য হবে অত্যন্ত চড়া।
টেকসই নীল অর্থনীতি
নীল অর্থনীতি নিজেই সমস্যার উৎস নয়; সমস্যার উৎস হল এর বাস্তবায়নের ধরন। প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে কেবল মুনাফাকেন্দ্রিক উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। বঙ্গোপসাগরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত পরিবেশগত সীমা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সামনে রেখে। টেকসই নীল অর্থনীতি মানে— স্থানীয় মৎস্যজীবী সমাজকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করা। গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বাড়ানো। প্লাস্টিক ও শিল্পদূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। সুন্দরবন ও ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে উন্নয়নের লাল রেখার বাইরে রাখা বঙ্গোপসাগরকে যদি কেবল সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে দেখা হয়, তবে তা নিঃশেষ হতে বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু যদি একে জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তবে উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য সম্ভব। আজ ভারতের নীল অর্থনীতির সামনে সেই কঠিন কিন্তু জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখে, তবে তাকে বুঝতে হবে— প্রকৃতি ধ্বংস করে কোনও অর্থনীতি টেকে না। জীবিকা ধ্বংস করে কোনও উন্নয়ন গণতান্ত্রিক হতে পারে না। আজ বঙ্গোপসাগরে যা চলছে, তা উন্নয়ন নয়— এটি রাষ্ট্র সমর্থিত কর্পোরেট দখল। এখনই রাজনৈতিক ইউ টার্ন না হলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না এই মুহূর্তে দরকার— প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনার (পিএমএমএসওয়াই) পুনর্বিন্যাস। সেই সঙ্গে সাগরমালা প্রকল্পে স্বাধীন পরিবেশ নিরীক্ষা। সুন্দরবন ও ম্যানগ্রোভকে ‘No-Go Zone’ ঘোষণা এবং মৎস্যজীবীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ। তারপরও প্রশ্ন একটাই— রাষ্ট্র কি কর্পোরেট চাপের ঊর্ধ্বে উঠে এই সিদ্ধান্ত নেবে, কি বঙ্গোপসাগর ইতিহাসে লেখা থাকবে এমন এক সমুদ্র হিসেবে, যেখানে উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ও মানুষ— দু’টোকেই ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
(লেখক সাংবাদিক)

