উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং শুল্ক-যুদ্ধের হুমকির মাঝেই বিশ্ব রাজনীতিতে ঘটে গেল এক নাটকীয় পালাবদল। তথাকথিত ‘ড্যাডি’ ট্রাম্পের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মঙ্গলবার ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ঘোষণা করল ‘মাদার অফ অল ট্রেড ডিল’ বা সর্বকালের সেরা বাণিজ্য চুক্তি (India-EU Trade Deal)। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, বরং ট্রাম্পের একতরফা দাদাগিরির বিরুদ্ধে ভারত ও ইউরোপের এক নীরব কিন্তু বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।
শত্রুর শত্রু যখন মিত্র
কাকতালীয়ভাবে, এই ঐতিহাসিক চুক্তির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে খোদ ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব। গত এক বছর ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে ‘ক্রেমলিনের লন্ড্রি’ আখ্যা দিয়ে রুশ তেলের ওপর এবং পারস্পরিক বাণিজ্যে মোট ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপিয়েছে। অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিবাদ এবং ন্যাটোর চাঁদা নিয়ে ইউরোপকেও ক্রমাগত অপমান করেছেন তিনি। ট্রাম্পের এই ক্রমাগত চাপ এবং ব্ল্যাকমেইলিং-এর কৌশলই কার্যত নিউ দিল্লি এবং ব্রাসেলসকে একে অপরের কাছে নিয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi) ট্রাম্পের ইগো বা অহংকে তুষ্ট না করে বরং ইউরোপের সাথে বন্ধুত্ব গাঢ় করার পথ বেছে নিয়েছেন।
চুক্তিতে কার কী লাভ?
দীর্ঘ দুই দশক ধরে ঝুলে থাকা এই চুক্তি অবশেষে আলোর মুখ দেখল।
- ভারতের লাভ: ট্রাম্পের শুল্কের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতের বস্ত্র, রাসায়নিক এবং গয়না শিল্প এখন ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত বা নামমাত্র শুল্কের সুবিধা পাবে। এটি ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন জোয়ার আনবে। কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যকে এই চুক্তির আওতার বাইরে রেখে মোদী সরকার দেশের কৃষকদের স্বার্থও সুরক্ষিত রেখেছে।
- ইউরোপের লাভ: বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গাড়ির বাজার ভারতে এখন ফোক্সওয়াগেন, মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিউ-এর মতো কোম্পানিগুলো সহজে প্রবেশ করতে পারবে। আমদানিকৃত গাড়ির ওপর শুল্ক ১১০% থেকে কমিয়ে ৪০%-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
ওয়াশিংটনে তোলপাড়
এই চুক্তি ঘোষণার পরেই ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ এবং মার্কিন ট্রেড সারের স্কট বেসেন্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন, ইউরোপ ভারতের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে সাহায্য করছে। তবে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, ভারত ও ইউরোপের এই কৌশলগত জোট ট্রাম্পকে বুঝিয়ে দিল যে, ধমক দিয়ে আর বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বনেতারা এখন ট্রাম্প-নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পথের সন্ধানে। আগামী বছর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই চুক্তি বিশ্বমঞ্চে ভারতের স্বাধীন বিদেশনীতির এক বড় জয়, যা প্রমাণ করে—সম্মানজনক আলোচনার মাধ্যমেই সেরা চুক্তি সম্ভব, জবরদস্তিতে নয়।

