ডিলিমিটেশনে লোকসভার আসন সংখ্যা এক ঝটকায় ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার পরিকল্পনা আছে কেন্দ্রের। মহিলা সংরক্ষণ বিলকে পাশ করানোর আড়ালে অদলবদলের এই খেলার ছক কষা হয়েছে। ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল সংসদের বিশেষ অধিবেশনে মহিলা সংরক্ষণ এবং ডিলিমিটেশন সংক্রান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল আনতে চলেছে কেন্দ্র।
প্রস্তাবিত ৮৫০টি আসনের মধ্যে ৮১৫টি আসবে রাজ্যগুলি থেকে এবং বাকি ৩৫টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য। মূলত মহিলা সংরক্ষণ বিল দ্রুত কার্যকর করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ বলে দাবি করা হচ্ছে। কেন্দ্রের পরিকল্পনা হল, ৮৫০টি আসনের ৩৩ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২৭২টি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা।
লোকসভার বর্তমান আসন বিন্যাস ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে নির্ধারিত। ২০০১ সালের ৮৪তম সংবিধান সংশোধনী আইন অনুযায়ী সংসদীয় এলাকার সীমানা এবং আসন সংখ্যা ২০২৬ সালের পর প্রথম জনগণনার তথ্য প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকার কথা। গত ১ এপ্রিল জনগণনা শুরু হয়েছে দেশে। চলবে ২০২৭ পর্যন্ত।
লোকসভার আসন বৃদ্ধির পথে প্রধান বাধা সংবিধানের ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ। প্রস্তাবিত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিলে সেই শর্তটি সম্পূর্ণ বাতিল করার ভাবনা রয়েছে। এতে ২০২৬-’২৭ সালের জনগণনার আগেই আসন বাড়ানো শুরু হতে পারে। বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও কেন্দ্র চাইছে ২০১১ সালের জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতে ডিলিমিটেশন সেরে ফেলতে, যাতে দ্রুত মহিলা সংরক্ষণ চালু করা যায়।
ডিলিমিটেশন নিয়ে সরকারের এই মরিয়া অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। সন্দেহ নেই আসন বাড়ানোর নেপথ্যে কয়েকটি বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। ১৯৭১ সালের পর ভারতের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে এক-একজন সংসদ সদস্য প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন, যা গুণগত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অন্তরায়।
ছোট নির্বাচনি এলাকা মানেই জনগণের সঙ্গে জনপ্রতিনিধির নিবিড় যোগাযোগ বৃদ্ধি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অবশ্য তামিলনাডু, কেরল, কর্ণাটকের মতো দক্ষিণের রাজ্যগুলি গত কয়েক দশকে অত্যন্ত সফল। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলি অনেকটা পিছিয়ে। ২০২৬ সালের পরবর্তী জনগণনার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে কার্যত শাস্তি পাবে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তুলনায় অসফল রাজ্যগুলি বেশি আসন পেয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ পেয়ে যাবে বলে বিরোধীদের আশঙ্কা। লোকসভার আসন ৮৫০ হলে শুধু উত্তরপ্রদেশের আসন ৮০ থেকে বেড়ে ১৪০ ছাড়াতে পারে। কেরল বা তামিলনাডুর আসন সংখ্যায় কিন্তু বিশেষ বৃদ্ধি ঘটবে না। ফলে দিল্লির তখতে বসার চাবিকাঠি চিরতরে হিন্দি বলয়ের হাতে বন্দি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
অথচ দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি দেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখে। কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারণে তাদের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হলে বিচ্ছিন্নতাবাদের ভাবনা উসকে যেতে পারে। জাতীয় নীতি মেনে জনসংখ্যা কমিয়ে উন্নয়নের পথে এগোলেও সেই সাফল্যের কারণে গুরুত্ব হারানোর আশঙ্কায় আছে দক্ষিণের রাজ্যগুলি। এ কেবল দক্ষিণ বনাম উত্তর নয়, বরং সুশাসনের সঙ্গে ক্ষমতার অদ্ভুত সংঘাত।
প্রশ্ন উঠছে, আসন সংখ্যা না বাড়িয়েও কি ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না? আসন সংখ্যা ৮৫০ করার লক্ষ্য কি মূলত উত্তর ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্যকে দীর্ঘস্থায়ী করা? বাস্তবে লোকসভায় ভারসাম্য রক্ষার জন্য রাজ্যসভাকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে বা আসন সংখ্যা বাড়িয়েও রাজ্যওয়াড়ি অনুপাত ১৯৭১ সালের স্তরে রাখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অর্থ প্রতিটি অঞ্চলের ন্যায়সংগত অংশীদারিত্ব। লোকসভার আসন বাড়িয়ে কেবল একটি বিশেষ অঞ্চলের শক্তিবৃদ্ধি ঘটানো হলে তা ভারতের সেই কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেবে। দক্ষিণ বা উত্তর- কোনও পক্ষকে বঞ্চিত করে ভারতের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী সংরক্ষণের উদ্দেশ্য যদি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি হয় তবে তা হবে কেন্দ্রের অদূরদর্শিতার পরিচয়।



