মুখেই শান্তির বাণী

শেষ আপডেট:

হিংসা বনাম শান্তির মধ্যে কখনও ভোটাভুটি হলে শান্তির জয় অনিবার্য। যিনি যেমনই আস্ফালন করুন, হিংসাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেন না কেউ। মনে যাই থাকুক, মুখে শান্তির বাণী লেগেই থাকে। প্রায় সব মানুষ শান্তির কথা বলেন। তবে শান্তির পায়রা ওড়ানো আর কোনও বিষয়ে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে নিরাপদ দূরত্ব তৈরি এক জিনিস নয়।

ইরানে আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান এবং সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই সহ কয়েকজন মন্ত্রী-কর্মকর্তার পাশাপাশি একটি স্কুলের ১৬৫ জন নিরপরাধ শিশুকন্যার মৃত্যু হয়েছে। চিরাচরিত যুদ্ধবাজ মানসিকতার আমেরিকা-ইজরায়েল ওই হামলা চালিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য ইরানের তেলের ভাণ্ডার কবজা করা।

এর আগে প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের লাগাতার হামলায় অগুনতি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বহু শিশু অনাথ। আমেরিকা ইতিপূর্বে হিরোশিমা, নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলেছে। ফাটানো থেভিয়েতনামে যুদ্ধ করেছে, ইরাক-আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালিয়েছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছে।

আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইজরায়েলের নেতানিয়াহু সরকারের এসব কুকীর্তির প্রতিবাদে ওইসব দেশেও প্রতিবাদ, বিক্ষোভ হয়েছে। বিশ্বের বহু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক মনে করেন, আমেরিকা ও ইজরায়েলের এই ইরানে অভিযান পুরোপুরি অন্যায়। ভারতীয়দের ধারণা প্রায় একইরকম। কিন্তু ভারত সরকার ইরানে সামরিক অভিযান নিয়ে টুঁ শব্দ করেনি।

যদিও আরব দেশগুলিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি লক্ষ্য করে ইরানের হামলার নিন্দায় বিবৃতি দিয়েছে নয়াদিল্লি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আবহে ভারতের পক্ষপাত নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। জোটনিরপেক্ষতার নীতি বরাবর ভারতের কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। সেই অবস্থানের অনেকটা এখন বদলে গিয়েছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের অবস্থানের গুরুত্ব হারাচ্ছে।

ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের শত্রুতা নতুন নয়। কিন্তু ওই দুটি দেশের আরেকটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালিয়ে যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ট্রাম্প, নেতানিয়াহুর যুদ্ধবাজ নীতিতে গোটা অঞ্চলের শান্তিভঙ্গ হয়েছে। অথচ ভারত সরকার একেবারে চুপ। এমন নয় যে ভারত অতীতেও এমন পরিস্থিতিতে নীরব ছিল।

বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে দেশের স্বার্থ সামলে ঠিককে ঠিক এবং ভুলকে ভুল বলার একাধিক অতীত নজির রয়েছে ভারতের। পরিস্থিতি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এখন সরাসরি আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলতে নয়াদিল্লি দ্বিধাগ্রস্ত। অপারেশন সিঁদুরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগ বাড়িয়ে সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা করলেও ভারত টুঁ শব্দ করেনি।

একইভাবে নেতানিয়াহুর অঙ্গুলিহেলনে গাজায় হত্যালীলার নিন্দায় সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষ পথে নামলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইজরায়েলে গিয়ে গাজা সংকট নিয়ে মুখ খোলেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মনমোহন সিং সরকারের পরমাণু চুক্তির বিরুদ্ধে দেশে প্রবল সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু মনমোহন পিছিয়ে যাননি। আবার ইরাকে হামলা করায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করতে ছাড়েননি।

কূটনৈতিক বন্ধুত্বের বাহানায় ন্যায়-অন্যায় গুলিয়ে ফেলা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। শান্তির পক্ষে থাকার অর্থ পিঠ বাঁচিয়ে চলা নয়। নিরপেক্ষ থাকার অর্থ ভালো-মন্দের জ্ঞান হারিয়ে ফেলা নয়। ভারত ইতিপূর্বে সমকালীন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রশ্নে অতীতে কখনও নীতিপঙ্গুত্বের কলঙ্ক ভারতকে স্পর্শ করতে পারেনি।

সেই ছবিটা ক্রমশ বিবর্ণ হচ্ছে। ভারতের বিরোধী শিবির ইরানে মার্কিন হামলা এবং খামেনেইয়ের হত্যা নিয়ে সরব। ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহু পুরোনো সম্পর্কের খাতিরে কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত নীরবতা ভেঙে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা।  ইরান সহ পশ্চিম এশিয়ার বহু দেশে প্রচুর ভারতীয় আটকে পড়েছেন। তাঁদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি যুদ্ধের বীভৎস ধ্বংসলীলা থেকে মানবধর্মকে রক্ষায় ভারতের সক্রিয়তা কাম্য।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

স্বস্তিতেও প্রশ্ন

ভারতে সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ বিরল নয় ঠিকই।...

ভোটের ভাষ্য

প্রতিশ্রুতি ছাপিয়ে প্রহারের বয়ান। রাজনৈতিক নয়, ভোটের ভাষ্য হয়ে...

অদূরদর্শিতা

ডিলিমিটেশনে লোকসভার আসন সংখ্যা এক ঝটকায় ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে...

শুধুই হতাশা

ডিলিটেড নামের তো ভবিষ্যৎ নেই-ই। ট্রাইবিউনালে আরও ৩৪ লক্ষেরও...