চিরঞ্জীব রায়
কথায় আছে, ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’। বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের অবস্থাও অনেকটা তেমনই। পরিবারের প্রত্যাশার চাপ, জেনারেশন গ্যাপ বা প্রজন্মের ব্যবধান, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পড়াশোনা এবং রুজিরুটির সংস্থানের অনিশ্চয়তা— এতসব বোঝা তো ছিলই। তার ওপর বিষাদ ও বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় যখন ‘জেন জেড’ বা মিলেনিয়ালরা দিশেহারা, ঠিক তখনই তাদের ক্ষতবিক্ষত মনের ওপর চরম আঘাত হানছে খোদ প্রকৃতি তথা পরিবেশ। পরিবেশ দূষণ যে কেবল ফুসফুস বা হৃদযন্ত্রের বারোটা বাজাচ্ছে তা নয়, এটি এখন সরাসরি থাবা বসাচ্ছে মানুষের মগজে, ভেঙে দিচ্ছে মানসিক স্থৈর্যের ভিত।
বিশ্বের দরবারে ভারতের তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের চিত্রটি অত্যন্ত ম্লান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্যাপিয়েন ল্যাব’ প্রকাশিত ‘গ্লোবাল মাইন্ড হেল্থ, ২০২৫’ শীর্ষক রিপোর্টে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ৭৮ হাজার ভারতীয় সহ বিশ্বের ৮৪টি দেশের প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের ওপর এই সমীক্ষা চালানো হয়। দেখা গিয়েছে, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সি ভারতীয় তরুণদের ‘মাইন্ড হেল্থ কোসেন্ট’ বা এমএইচকিউ স্কোর মাত্র ৩৩। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল, একই দেশের পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই স্কোর ৯৬। অর্থাৎ, একই জল-হাওয়ায় বসবাস করলেও দুই প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক বিদ্যমান। কেন প্রবীণদের তুলনায় নবীনরা মানসিকভাবে এত বেশি ভঙ্গুর? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল পারিবারিক বা সামাজিক কারণ নয়, কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে আমাদের চারপাশের দূষিত পরিবেশকেও।
স্যাপিয়েন ল্যাব-এর এই সূচকটি কেবল মানসিক চাপের হিসেব দেয় না। এটি একজন মানুষের মনোযোগের গভীরতা, আবেগীয় নির্ভরতা এবং সমাজের সঙ্গে তার সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতাকেও পরিমাপ করে। একবিংশ শতাব্দীতে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে আসা, শৈশব থেকেই স্মার্টফোনের দুনিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকা, ফাস্ট ফুডের নেশা এবং আধ্যাত্মিক চেতনার অভাবকে এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এর সমান্তরালে আরেকটি ভয়ংকর সত্য সামনে আসছে— আর তা হল পরিবেশের ক্রমাগত অবক্ষয়। ভারতের অধিকাংশ জনবহুল এলাকায় বায়ুর গুণমান বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার থেকে বহুগুণ বেশি। এই বিষাক্ত বাতাস যখন নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে, তখন তা কেবল রক্তকণিকাকে নয়, বিষিয়ে দেয় স্নায়ুতন্ত্রকেও।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পরিবেশ দূষণের কারণে সৃষ্ট ‘মন খারাপ’ বা অবসাদের শিকার প্রবীণদের তুলনায় তরুণরাই বেশি। এর কারণটি ঐতিহাসিক। আজকের পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রজন্ম তাদের জীবনের দীর্ঘ সময় তুলনামূলক স্বচ্ছ ও নির্মল পরিবেশে অতিবাহিত করেছে। তাদের শৈশব কেটেছে সবুজ মাঠ আর বিশুদ্ধ বাতাসে। অন্যদিকে, আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন এক সময়ে, যখন যথেচ্ছ সবুজ নিধন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ সভ্যতাকে গ্রাস করে ফেলেছে। তারা শরীরের পুষ্টির জন্য যতটা না দুধ-ঘি খেয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সেবন করেছে বাতাসের বিষ। ফলে তাদের সহ্যশক্তি এবং মানসিক কাঠামোর বুনন জন্ম থেকেই কিছুটা দুর্বল।
এই মানসিক অস্থিরতার ভয়াবহতা বোঝা যায় শিশুদের ওপর চালানো বিভিন্ন সমীক্ষায়। গত বছরে দিল্লি এবং সংলগ্ন ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়নের ১২৫৭ জন শিশু-কিশোরের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, তাদের ৭০ শতাংশই কোনও না কোনওভাবে অবসাদগ্রস্ত। ৭৭ শতাংশ শিশু সর্বদা একপ্রকার নিরাপত্তাহীনতা, উদ্বেগ ও বিরক্তির শিকার। মনোবিদরা এই বিশেষ অবস্থাকে ‘ক্লাইমেট অ্যাংজাইটি’ বা জলবায়ুজনিত দুশ্চিন্তা বলে অভিহিত করছেন। ঘনঘন তাপপ্রবাহ, হড়পা, খরা বা সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল আমাদের রুটিনকে ওলটপালট করছে না, আমাদের অবচেতন মনে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক চরম অনিশ্চয়তা ও ভীতি গেঁথে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের শেষ ভাগে ‘ডাউন টু আর্থ’ নামক সংস্থা ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সি ৩০০ জন ভারতীয় তরুণের ওপর একটি সমীক্ষা চালায়। সেখানে দেখা যায়, ৯৪ শতাংশ তরুণ মনে করেন যে পরিবেশ পরিবর্তন সরাসরি তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করছে। এঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি তরুণ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কিত ও হতাশ। ল্যানসেট স্টাডির তথ্যানুসারে, ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ যুবসমাজ আজ ‘ইকো অ্যাংজাইটি’ বা পরিবেশগত বিপর্যয়ের নাছোড়বান্দা ভয়ে কুঁকড়ে আছে। এই ভয় তাঁদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা এবং সৃজনশীলতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
বিজ্ঞান কী বলছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী ক্লারা জি জুন্ডেল বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এক গবেষণাপত্র পেশ করেছেন। সেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বায়ুদূষণ সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ— হিপোক্যাম্পাস, অ্যামিগডালা এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স-এর ক্ষতিসাধন করে। উল্লেখ্য, মস্তিষ্কের এই অংশগুলোই মানুষের আবেগ, অনুভূতি এবং যুক্তিবোধ নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং, যখন বাতাসে পিএম ২.৫ বা অন্যান্য সূক্ষ্ম ধূলিকণার মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখন তা সরাসরি আমাদের মগজাস্ত্রকে ভোঁতা করে দেয়। যার চূড়ান্ত পরিণতি হল খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা।
স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সামাজিক মাধ্যমের মায়া দুনিয়া তরুণদের মধ্যে যে অতৃপ্তি ও ঈর্ষা তৈরি করে রেখেছে, দূষণ তাতে অনুঘটকের কাজ করছে। জীবিকার ইঁদুরদৌড় এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির চাপে এমনিতেই তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জমি অনুর্বর ছিল, সেখানে পরিবেশের এই বিষাক্ত ছোঁয়া যেন নতুন করে ধ্বংসের বীজ বপন করছে। আজ বেঙ্গালুরুর মতো উদ্যান শহর তার সবুজ তকমা হারাচ্ছে, দিল্লির মানুষ নিঃশ্বাস নিতে না পেরে শহর ছাড়তে চাইছে। এই পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তবে আগামীদিনে দেশের কর্মক্ষম যুবশক্তির বড় একটি অংশ মানসিক বিকলতার শিকার হবে, যা যে কোনও দেশের অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত।
তবে কি কোনও আশার আলো নেই? পথ নিশ্চয়ই আছে। সমস্যার সমাধান কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি ও প্রশাসনিক স্তরে দৃঢ় পদক্ষেপ। দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইনগুলোকে কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে। নগরায়ণের সংজ্ঞায় কেবল ইমারত নয়, সবুজের নিবিড় সান্নিধ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, আবহাওয়া সংক্রান্ত বা পরিবেশগত নীতির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। চিকিৎসকদের যেমন বায়ুদূষণ সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে, তেমনই পরিবেশবিদদেরও মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল না রেখে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে হবে পরিবার ও সমাজকে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের মন কোনও যান্ত্রিক যন্ত্র নয় যে তা কেবল নির্দেশনায় চলবে। সেই মনের জন্য চাই বিশুদ্ধ বাতাস আর নির্মল আকাশ। পৃথিবী যদি মানুষের বাসযোগ্য না থাকে, তবে সেই পৃথিবীতে সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাই আগামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বার্থে পরিবেশ বাঁচানো এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার একমাত্র লড়াই।
(লেখক প্রাবন্ধিক)



