যন্ত্রের জয়জয়কারে ফিকে অকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দীপ্তি?

শেষ আপডেট:

(কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের সৃজনশীল মেধা ও সংবেদনশীলতার বিকল্প হতে পারে? প্রযুক্তির আলোয় এক বিশ্লেষণ।)

ডঃ তাপস চট্টোপাধ্যায়

দিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত চতুর্থ আন্তর্জাতিক সামিটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক নতুন আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। ১৬ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত এই শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বের ২০ জন রাষ্ট্রপ্রধান এবং ৫০০ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একত্রিত হয়ে এআই প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। সামিটের মূল তিনটি স্তম্ভ ছিল মানুষ, গ্রহ এবং অগ্রগতি- যা মূলত মানবজাতির সমৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দেয়। এই সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাপত্র থেকে স্পষ্ট যে, এআই শুধুমাত্র একটি যন্ত্র নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক উন্নয়নের একটি হাতিয়ার হতে পারে, যা আগামীর পৃথিবী গঠনে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

যতই দিন যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন লার্নিং এলগরিদম মানুষের চিন্তাশক্তিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার দাবি তুলছে। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা মাইক্রোসফট কোপাইলটের মতো জেনারেটিভ সিস্টেমগুলি আজ কবিতা লেখা, কোডিং করা এমনকি জটিল রোগ নির্ণয়ের মতো কাজও অতি দ্রুত করতে সক্ষম। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যন্ত্র কি তবে শেষপর্যন্ত মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাপিয়ে ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ হয়ে উঠবে? তবে এই তুলনাটি অনেকাংশেই ত্রুটিপূর্ণ, কারণ বুদ্ধিমত্তা কেবল ব্যক্তিগত মেধা বা পারদর্শিতার সংমিশ্রণ নয়, এটি মূলত একটি ব্যাপক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফসল। যন্ত্রের দ্রুততা মানুষের চিন্তার গভীরতাকে স্পর্শ করার ক্ষমতা রাখে না।

মানব বুদ্ধিমত্তা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত সম্মিলিত জ্ঞানের নির্যাস। কোনও বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কিংবা শিল্পকলা এককভাবে সৃষ্টি হয় না, বরং তা দলবদ্ধ চর্চা, সমালোচনা এবং ঐতিহ্যবাহী অভিজ্ঞতার ফল। ভাষা থেকে শুরু করে সামাজিক মূল্যবোধ- সবই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার বছরের মানবিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। আমাদের এই অকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল পরিসংখ্যানের হিসাব নয়, বরং পরিবার, সংস্কৃতি এবং অভিজ্ঞতার এক অনন্য সমন্বয়ে বিকশিত, যা মেশিন লার্নিংয়ের পক্ষে কখনোই আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। মানুষের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে এক সুদীর্ঘ ইতিহাসের আবেগ ও উপলব্ধি।

বিপরীতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল অসংখ্য তথ্যের পরিসংখ্যানগত বিন্যাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এআই ব্যবস্থাগুলির কোনও আবেগ, সহানুভূতি, সচেতনতা বা নৈতিক দায়বদ্ধতা নেই। তারা মূলত ডেটার প্যাটার্ন অনুসরণ করে প্রতিক্রিয়ার ছক তৈরি করে মাত্র। এছাড়া তাদের প্রশিক্ষণের ভিত্তিটিও বেশ সংকীর্ণ; ইন্টারনেটের তথ্যের বড় অংশই মাত্র কয়েকটি ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকায়, এআই কখনোই ৮০০ কোটি মানুষের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। তাই মানুষের সহজাত বোধ এবং পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যন্ত্রের চেয়ে সর্বদা উচ্চতর। যন্ত্রের গাণিতিক হিসাবের তুলনায় মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি জটিল ও সংবেদনশীল।

অবশ্য এআই-এর অসীম কার্যকারিতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। শিক্ষা, প্রশাসন এবং গবেষণার ক্ষেত্রে এটি আমাদের উৎপাদনশীলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ডিজিটাল আকাঙ্ক্ষা পূরণে ভারতের মতো দেশের জন্য এটি এক বিশাল সুযোগ। তবে যন্ত্রের এই দক্ষতা কখনোই মানুষের সৃজনশীলতা ও নৈতিক চিন্তার সমকক্ষ হতে পারে না। দিনশেষে এআই একটি শক্তিশালী সহায়ক মাত্র, প্রতিস্থাপন নয়। মানব বুদ্ধিমত্তা চিরকালই অকৃত্রিম এবং তার নিজস্বতা, গভীরতা ও সংবেদনশীলতা কোনও যান্ত্রিক এলগরিদমের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে কখনোই বন্দি হতে পারে না, বরং তা উত্তরোত্তর বিকশিত হবে।

(লেখক উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন রেজিস্ট্রার)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

নিরপেক্ষতার প্রতীক এক সাহসী প্রশাসক

ভোটারদের অধিকার সুরক্ষায় এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রথম নির্বাচন...

হে নূতন দেখা দিল আলোক-লগনে

বাংলাদেশে বাঙালির নববর্ষ বহু অমৃতের সন্ধান দিল। মৌলবাদীদের সক্রিয়তার...

অবিরাম পরিবর্তনের নামই সংস্কৃতি

ইতিহাসের ধারায় সমন্বয় ও অভিযোজনের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে সভ্যতার...

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও রাজনীতির মিথ্যাচার

রাজনীতির আঙিনায় প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক বারবার সাধারণ মানুষের...