দেবাশীষ সরকার
পরিবর্তন হল প্রকৃতির একমাত্র শাশ্বত ও অমোঘ নিয়ম। এই ধ্রুবসত্যকে মেনেই প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর সমাজ ব্যবস্থা, বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, সভ্যতার এই বিবর্তনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে সন্ত্রাসবাদ এবং তার ধারক-বাহকরাও। এক দশকেরও আগে আল-কায়দার ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নিয়েছিল আইএসআইএস বা ‘ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া’। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা তাদের যে নতুন রূপটি প্রত্যক্ষ করছি, তাকে অনায়াসেই বলা যায় সন্ত্রাসবাদের ‘ভার্সন ২.০’। এই সংগঠনটির মূল ভিত্তি ছিল একটি বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করা। আরবি শব্দ ‘খিলাফাহ’ বা খেলাফতের আক্ষরিক অর্থ হল উত্তরাধিকার বা প্রতিনিধিত্ব। এটি ইসলামের একটি নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে ইসলামি আইনের বাস্তবায়ন এবং সমাজ পরিচালনার জন্য একজন ‘খলিফা’ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। নিজেদের এই উগ্র মতাদর্শকে ছড়িয়ে দিতে আইএসআইএস প্রথম থেকেই চরম সহিংসতাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ, আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং অকল্পনীয় নৃশংসতার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। মূলত সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় করেই তারা সদস্য সংগ্রহ এবং তহবিল গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ডিজিটাল উগ্রবাদ ও নেটওয়ার্কের বিকেন্দ্রীকরণ
২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আইএসআইএস-এর কর্মকাণ্ড মূলত ইরাক ও সিরিয়ার একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে ‘খেলাফত’ হিসেবে কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই চেনা ছকটি আমূল বদলে গিয়েছে। বর্তমানে তারা একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্রের বদলে বিকেন্দ্রীকৃত, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এবং অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর এক বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। একে সমাজ বিজ্ঞানীরা ‘ডিজিটাল উগ্রবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এখন আর কোনও একটি নির্দিষ্ট বড় শক্তিকেন্দ্রের বদলে তারা স্থানীয় স্তরে ছোট ছোট সেল বা গোষ্ঠী তৈরি করছে। এই প্রযুক্তি-পরিণত চেহারায় তাদের সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের সুযোগ সন্ধানের গতি বেড়ে গিয়েছে বহুগুণ। এরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই চ্যাটবট’ ব্যবহার করে অত্যন্ত সুচতুরভাবে নিজেদের তথ্যের প্রচার চালাচ্ছে। এই চ্যাটবটগুলো যেমন একদিকে উগ্র মতাদর্শ প্রচার করে, অন্যদিকে নতুন সদস্যদের জন্য অনলাইন ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করে। প্রযুক্তির এই ভয়াবহ ব্যবহারে তারা এখন অনেক বেশি সক্ষম এবং অদৃশ্য হয়ে উঠেছে। ফলে কোনও সুনির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে তাদের আর আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
লোন উলফ ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র
সন্ত্রাসবাদের এই নতুন সংস্করণে সবচেয়ে ভয়াবহ সংযোজন হল ‘লোন উলফ’ বা একক আক্রমণকারীর ধারণা। এটি মূলত একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়াকলাপ। আদর্শগত, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় চরমপন্থী বিশ্বাস দিয়ে কিছু মানুষকে এমনভাবে মগজধোলাই করা হয় যে, তারা কোনও বৃহত্তর সাংগঠনিক সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে হিংসাত্মক হামলার পরিকল্পনা করে এবং তা কার্যকর করে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিটি সফল হোক বা ব্যর্থ, মূল সংগঠন সবসময় পর্দার আড়ালে নিরাপদ দূরত্বে থেকে যেতে পারে। এই কারণেই সুসংগঠিত গোষ্ঠীর তুলনায় এই ধরনের একক স্বেচ্ছাসেবকদের শনাক্ত করা বিশ্বের যে কোনও গোয়েন্দা সংস্থার জন্য এক কঠিনতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই লোন উলফদের কাজের প্রতি সামাজিক সমর্থন বাড়ানোর জন্য তারা ডিজিটাল মঞ্চ ব্যবহার করে সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। ছাপার অক্ষরের প্রতি সাধারণ মানুষের সহজাত বিশ্বাসকে পুঁজি করে ইন্টারনেটে প্রচার চালানো হয়। ভারতেও কেরল বা কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলিতে এই ধরনের ছোট ছোট স্বাধীন গোষ্ঠীর উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূ–রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভারতের নিরাপত্তা
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমেরিকা ও ইজরায়েল বনাম ইরানের সংঘাতের অভিঘাত গোটা বিশ্বের পাশাপাশি ভারতেও এক গভীর অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। ভারতের মতো দেশে, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানির পথে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, সেখানে অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক বাণিজ্যের টালমাটাল অবস্থা এক ভিন্ন ধরনের সামাজিক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই দেশের অভ্যন্তরে নানা প্রতিষ্ঠানবিরোধী চিন্তাভাবনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, যা আইএসআইএস-এর মতো সংগঠনগুলোকে তাদের প্রভাব বিস্তারের উর্বর জমি তৈরি করে দিচ্ছে। ভারতের মতো বিশাল জনবহুল দেশে ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তার এবং শিক্ষার গুণগত মানের ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে যে কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষোভকে খুব সহজেই উগ্রবাদে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। সুকৌশলে সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন গেম এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে এই প্রচার চালানো হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা তালিবানের সঙ্গে আইএসআইএস-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভারতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ‘প্রহার’ নামে একটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হল ডার্ক ওয়েবের মতো সাইবার জগতের অন্ধকার কোণগুলিতে কড়া নজরদারি চালানো এবং সম্ভাব্য সাইবার বা ফিজিকাল আক্রমণ প্রতিহত করা।
সতর্কতা ক্লান্তি ও যুদ্ধের নেপথ্য সমীকরণ
আইএসআইএস-এর এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে বৈশ্বিক গোয়েন্দা জগতেও এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। এখন লড়াইটা আর শুধু বন্দুক-গুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রখর মগজ ও উন্নত প্রযুক্তির লড়াই। তবে এই ডিজিটাল নজরদারি করতে গিয়ে তৈরি হয়েছে আর এক নতুন সমস্যা— যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘অ্যালার্ম ফ্যাটিগ’ বা ‘সতর্কতা ক্লান্তি’। প্রতিদিন অজস্র ডিজিটাল তথ্য এবং সতর্কবার্তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, ফলে আসল বিপদের সংকেতটি অনেকসময় হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক দিকটিও অত্যন্ত বিস্ময়কর। একটি আত্মঘাতী জ্যাকেট তৈরি করতে আইএসআইএস-এর খরচ হয় বড়জোর দেড় লক্ষ টাকা। অথচ ২০০১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু আমেরিকা একাই সন্ত্রাসবাদবিরোধী কাজে খরচ করেছে প্রায় ৮ কোটি কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতিটি দেশকে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো জরুরি জনকল্যাণমূলক খাত থেকে কেটে এনে খরচ করতে হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে সমাজে আরও অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। মজার বিষয় হল, উগ্রপন্থী এবং তাদের বিরোধী পক্ষ— উভয়ই আসলে মানুষ। উভয়েরই মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র ও শিক্ষা। অথচ তারা লড়ছে একে অপরের বিরুদ্ধে। এই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের সুতো সম্ভবত ওপরের স্তরের এমন কারও হাতে বাঁধা, যারা এই ধ্বংস থেকেই নিজেদের মুনাফা লুটে নিচ্ছে। লড়াইটা তাই কেবল ধর্মের বা ভূখণ্ডের নয়, বরং এটি এক গভীর ব্যবস্থাগত চক্রান্ত।
(লেখক সাংবাদিক)



