নেতা পালটে তৃণমূলের চরিত্র বদল অসম্ভবই

শেষ আপডেট:

গৌতম সরকার

কাজ দেখাতে না পারলে বাপি বাড়ি যা। তৃণমূলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তাটা অনেকটা সেরকমই ছিল। ব্রিগেডে দলের সর্বশেষ সভায় তিনি তিন মাসের মধ্যে সাংগঠনিক ঝাঁকুনি দেবেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে গত ৭ নভেম্বর নিজের জন্মদিনে জানিয়েছিলেন, রদবদলের তালিকা তিনি দলনেত্রীর হাতে তুলে দিয়েছেন। অতঃপর সিদ্ধান্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তারপর আরও তিন সপ্তাহ পার। দলে এখনও নট নড়নচড়ন।

বদলের কোনও হাওয়া মালুম হচ্ছে না। সপ্তাহখানেক আগে তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে প্রসঙ্গটি আলোচনাতেই আসেনি। বৈঠকে উপস্থিত অভিষেকও রা কাড়েননি। বৈঠকের নির্যাসে বরং স্পষ্ট, মমতা দলে নিজের বজ্রমুষ্টি আরও শক্ত করলেন। উপনির্বাচনে রাজ্যে ৬-এ ৬ সাফল্যে দলের আরও শ্রীবৃদ্ধির পর তৃণমূলে গুঞ্জন উঠেছিল, অভিষেকের অপছন্দের তালিকায় থাকা নেতাদের আর রেহাই নেই। আলোচনা শুরু হয়েছিল, কিছু নেতা, পদাধিকারীদের ঘাড়ে কোপ পড়ল বলে।

অভিষেক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অন্তত ১৫টি জেলায় সাংগঠনিক রদবদল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। বলির পাঁঠা হবেন কয়েকটি পুরসভার চেয়ারম্যানরাও। উপনির্বাচনের ফলাফলের আগেই মাল পুরসভার চেয়ারম্যান স্বপন সাহার সাসপেনশন সেই জল্পনায় ঘি ঢেলেছিল। হা হতোস্মি। কোথায় কী! সকলেই বহালতবিয়তে। বরং জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে বিভিন্ন স্তরে দলীয় মুখপাত্রদের অদলবদলে থেকে গেলেন পুরোনো মুখেরাই।

তবে অভিষেকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী আর কোনওদিন দাওয়াই দেওয়া হবে না- এটা ভাবারও কারণ নেই। কারণ, দলটার নাম তৃণমূল। নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী দল থাকার সময় থেকে তৃণমূলে কখন কী বদল হবে, আগাম কেউ জানতেন না। সমস্যাটা আসলে অন্য। এই ধরুন না, জলপাইগুড়িতে কোনও পুরসভা আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু চেয়ারম্যান বদল করলে বিকল্প কে? ভাইস চেয়ারম্যানের ঘাড়ে তো মামলা ঝুলছে।

গৌতম দেবকে সরালে শিলিগুড়ির মেয়র পদে দ্বিতীয় নামটা বলুন তো! মালদায় বাম দল থেকে আসা আব্দুল রহিম বক্সীকে জেলা সভাপতি করে রাখা হয়েছে। পারফরমেন্স কী! দুর্নীতি বা অকথাকুকথা ছাড়া আর কোনও বিষয়ে মালদায় তৃণমূলের নাম উচ্চারিত হয় না।

সভাপতি বদলালে কে হবেন তাঁর উত্তরসূরি? একটা নাম বলুন। পুরোনো যাঁরা আছেন, তাঁরা কোনও না কোনও সময় সভাপতি হয়েছেন। নিজেদের মধ্যে কোন্দল ছাড়া উল্লেখযোগ্য তোনও পারফরমেন্স দেখাতে পারেনি।অভিষেকের অপছন্দের লোকদের মাথা কাটা যেতেই পারে। যদিও সেই তালিকায় মমতার পছন্দের কেউ থাকলে তাঁকে শাস্তি দেওয়া কঠিন। তা সত্ত্বেও অভিষেকের প্রেসক্রিপশন মেনে রদবদল করা হলে সেটা অনেকটা অন্ধের বদলে খোঁড়াকে দায়িত্ব দেওয়ার শামিল হবে। তবে সকলের মাথায় রাজ্য নেতাদের কারও না কারও আশীর্বাদি হাত আছে।

তৃণমূলে সাংগঠনিক বাঁধন আছে, আবার উপেক্ষাও আছে। শৃঙ্খলা অমান্য করে টিকে থাকাও যায়। মাল পুরসভার চেয়ারম্যান স্বপন সাহাকে তৃণমূল বহিষ্কার করেছে। কিন্তু চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরায়নি। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ তো পুরসভাকে কেন্দ্র করেই। তিনি এখনও বহালতবিয়তে পুরসভার ‘রাজ্যপাটে’ বহাল। তাহলে এমন ‘শাস্তি’র অর্থ কী!

যে যা খুশি করো, শুধু আনুগত্যটা রেখো। বিজেপিতে চলে যেও না। তৃণমূলের সাংগঠনিক বাঁধনটা এক কথায় এরকম। যদি বা বিজেপিতে যাও, সাবধান! কোনও না কোনও অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে যেত পারো। নিদেনপক্ষে পুলিশি হেনস্তা অবধারিত। কারণ বায়োডেটা খুঁজলে অনেকের পিছনে কিছু না কিছু অসংগতি, অনিয়মের শরিক হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাবেই।

তবু দলটা ভোট পায়। ভোটের বিচারে রাজ্যে শাসকদলের ধারেকাছে কেউ নেই। বিরোধীরা যুক্তি দেয়, ওটা জনমতের প্রতিফলন নয়। জবরদস্তি ভোট কেড়ে নেয় তৃণমূল। এই আক্ষেপে প্রমাণ হয়, সেই জবরদস্তিতেও বিরোধীরা বহুদূর। স্থানীয় স্তরের নেতারা না থাকলেও হয়তো তৃণমূল ভোট পাবে। আগে কিছু মানুষ ভোট উৎসর্গ করতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। এখন ভোট আসে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কৃষকবন্ধু, সবুজ সাথীর সুবাদে।

বিজেপির হাতে হিন্দুত্ব ছাড়া আর কোনও পেন্সিল নেই। আরজি কর মেডিকেলে চিকিৎসকের মৃত্যুকে হাজার চেষ্টা করেও জনমত দলের পক্ষে প্রভাবিত করতে পারেনি বিজেপি। এখন বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন নিয়ে আবার কোমর বেঁধে লেগেছে। দেশের অন্য প্রান্তে হিন্দুত্ব যতটা বেনিফিট দেয়, বাংলায় যে তা দেয় না, তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। বরং নরেন্দ্র মোদির ভাষায় রেউড়ি (পাইয়ে দেওয়া) সংস্কৃতি তৃণমূল এমনভাবে গ্রহণ করেছে, যা দলকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।

আরজি করকে ব্যবহার করে নিজেদের পালে হাওয়া লাগানোর চেষ্টা করেছিল বামেরাও। প্রাথমিকভাবে কিছুটা কাজে এসেছিল সেই কৌশল। কিন্তু মূল আন্দোলনের ধার কমে যাওয়ায় হাওয়াটা চুপসে গিয়েছে। এখন আবার জুনিয়ার ডাক্তারদের একাংশকে সামনে রেখে গ্রামে গ্রামে অভয়া মঞ্চ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। আলিপুরদুয়ারে সম্প্রতি জুনিয়ার ডাক্তারদের সভায় বাম দলগুলির জেলা সম্পাদকদের উপস্থিতিতে তা ফাঁস হয়েছে।

অন্য সংগঠনের ভেতর লুকিয়ে কাজ করা বামেদের বরাবরের ঘোষিত রীতি। কিন্তু সেই লুকিয়ে কাজ ফাঁস হয়ে গেলে আর উদ্দেশ্য সাধন হয় না। তাছাড়া আরজি করের অভিঘাত এমন ফিকে হয়ে গিয়েছে (আন্দোলনের দুর্বলতায়) যে, তাকে টেনে তোলা কঠিন। বিরোধীদের এসব দুর্বলতার ফাঁকফোকর তৃণমূলকে নিশ্চিন্ত করে। তাছাড়া দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে তৃণমূলের বড়ই অনীহা। যে কারণে অভিষেকের রদবদলের ব্লুপ্রিন্ট আপাতত হিমঘরে।

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

স্বৈরতন্ত্রের পতন তো সর্বত্র এভাবেই হয়

রূপায়ণ ভট্টাচার্য সান্ধ্য জাগো বাংলার ৩ মে’র শিরোনাম : কাল...

হিংসা হারুক, জয় হোক মনুষ্যত্বের

শুভঙ্কর চক্রবর্তী পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছবিটা স্পষ্ট...

রেডি, স্টেডি, গো… লাফের বিশেষজ্ঞরা আজ তৈরি

রূপায়ণ ভট্টাচার্য বাংলার নির্বাচনি বুথফেরত সমীক্ষা দেখে পাড়ার পচাদার খুব...

অন্ধকারেই গণতন্ত্রের অদৃশ্য কারিগররা

বৃহস্পতিবার, রাত তখন ২টো ২৫। শিলিগুড়ির তিনবাত্তি মোড় যেন...