দীপককুমার রায়
উত্তরবঙ্গ ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র সংস্করণ। বিভিন্ন জাতি, জনজাতির মানুষ বসবাস করেন এই এলাকায়। প্রায় ১৫১টি ভাষার মানুষ উত্তরবঙ্গে বসবাস করে চলেছেন দীর্ঘকাল ধরে। তাঁদের সংস্কৃতি এবং চিরাচরিত পরম্পরা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধন করে চলেছে। এই একতা যেমন উত্তরবঙ্গকে শক্তিশালী করেছে তেমনি ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গকে নিয়ে চিন্তাও বাড়ছে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে আটটি জেলা নিয়েই উত্তরবঙ্গ। দেশের এই অংশটি আন্তর্জাতিক সীমানা প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত। উত্তরে ভুটান, চিন, পূর্বে বাংলাদেশ, পশ্চিমে নেপাল। অর্থাৎ নেপাল সীমান্ত, ভুটান সীমান্ত, বাংলাদেশ সীমান্ত এবং চিন সীমান্তের পার্শ্ববর্তী এলাকাজুড়ে উত্তরবঙ্গ। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের উক্ত ভৌগোলিক অবস্থান এবং তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে সীমান্ত এলাকা নিয়ে আমরা কতটুকু সচেতন সেই প্রশ্ন উঠছে।
সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিনিয়ত আমরা লক্ষ করছি উত্তরবঙ্গের সীমান্ত এলাকা দিয়ে চোরাচালানের খবর। গোরু, মাদক, অস্ত্র, জাল নোট পাচার ইত্যাদি বিষয় যা জনজীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ। অন্যদিকে, অবৈধ কার্যকলাপ প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। এখনও সর্বত্র কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি সীমান্তের হাঁড়ি পুকুর থেকে শুরু করে জলপাইগুড়ি জেলার বেরুবাড়ির সীমান্ত সমস্যা আজও মেটানো সম্ভব হয়নি। কাঁটাতারের ওপারে থাকা ভারতীয় ভূখণ্ড স্বাধীন দেশে পরাধীনতার প্রতীক হয়ে গিয়েছে।
সীমান্তের ভূবৈচিত্র্য ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে। জনসংখ্যার পরিবর্তন সীমান্তের নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই উত্তরবঙ্গে রয়েছে বহু আলোচিত চিকেন নেক, শিলিগুড়ির পার্শ্ববর্তী এই করিডর মাত্র ২২ কিলোমিটার সংকীর্ণ অংশ। এই করিডরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্য। আর এই চিকেন নেক-এর পার্শ্ববর্তী সীমান্ত এলাকা নিয়ে আমরা কি সত্যিই চিন্তিত? চিকেন নেক-এর গুরুত্ব, সীমান্ত সুরক্ষার প্রয়োজন সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের আদৌ কি সরকার প্রকৃত সচেতন করতে পেরেছে? এই প্রশ্নগুলো উঠছে। কারণ, একদল ভারতীয়র সহযোগিতাতেই দেশবিরোধী শক্তিগুলো আমাদের ভূখণ্ডে সক্রিয় হয়েছে। আমাদের কোনও না কোনও সহ নাগরিকের প্রশ্রয়েই সীমান্তে পাচার কারবার চলছে। সেই পাচারের রুট ধরেই বাড়ছে অনুপ্রবেশ, জঙ্গি আনাগোনা।
কিছু টাকার লোভে আমাদের দেশের নাগরিকরাই দেশবিরোধী শক্তিদের মদত দিচ্ছে। শুধু সাধারণ নাগরিকই নন, বহু ক্ষেত্রেই প্রশাসনের কর্মী, জনপ্রতিনিধি, নেতারাও মদতদাতা হয়ে উঠছে। তাই এদেশে ঢুকেই অনুপ্রবেশকারীরা তৈরি করে ফেলতে পারছে ভারতীয় পরিচয়পত্র। ঘুষ নিয়ে চোরাকারবারিদের ছাড়পত্র দিচ্ছে পুলিশের একাংশ। জনপ্রতিনিধি, নেতাদের নামও জড়াচ্ছে বেআইনি কারবারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জেনেবুঝে, কিছু ক্ষেত্রে না বুঝেই দেশবিরোধী শক্তিগুলোর ‘ভরসা’ হয়ে উঠছে ভারতীয়রাই। সীমান্ত এলাকায় এইসব কাজ বেশি হচ্ছে। তাই দেশরক্ষায় সীমান্ত সুরক্ষার গুরুত্ব সবাইকেই বুঝতে হবে বা বোঝাতে হবে। উত্তরবঙ্গের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় সেটা বোঝা আরও জরুরি।
এই মুহূর্তে আমরা সে অর্থে সুরক্ষিত নই। অবৈধ অনুপ্রবেশের জনশ্রুতি যেভাবে উঠে আসছে তা আমাদের অস্তিত্বের প্রতি আরেকবার জিজ্ঞাসা চিহ্নের অবতারণা করে। এই দেশ আমার, আপনার সবার। এই দেশ আমাদের পবিত্র ভূমি, এই দেশকে রক্ষা করা সকলেরই দায় ও দায়িত্ব।
অথচ আমরা যারা নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছি অথবা প্রশাসনের নানা স্তরে আছি অথবা জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছি আমরা কি পেরেছি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে? কতটা পেরেছি চোরাচালান কারবার বন্ধ করতে?
শুধু বিএসএফ, পুলিশ বা রাষ্ট্রশক্তি সক্রিয় হলে হবে না। উত্তরবঙ্গের মতো সীমান্ত ঘেরা এলাকায় সাধারণ নাগরিকরা সচেতন না হলে সীমান্ত একশো শতাংশ সুরক্ষিত করা কখনোই সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলিকেও এক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে ভোটের রাজনীতি দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।
প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই বুথ স্তর থেকে সংগঠন আছে। তাই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা যাতে বেআইনি উপায়ে ভারতীয় নাগরিকত্বের নথি তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা, কর্মী এবং বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদেরও। এলাকায় পান থেকে চুন খসলে সবার আগে খবর যায় সেখানকার নেতাদের কাছে। তাই দলমত ভুলে দেশের সুরক্ষার স্বার্থে সব রাজনৈতিক কর্মীরা সচেতন হলে অনেক সহজেই বহু নাশকতা আমরা রুখে দিতে পারব।
(লেখক রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য)



