প্রায় ৯০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নেই। তবু জীবনীশক্তির অভাব নেই। ভাগ্যের চাকা না ঘুরলেও পেটের টানে ভ্যানরিকশার চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন মানুষটা। তুলে ধরলেন রণবীর দেব অধিকারী।
ইটাহার: সমস্ত বৈভব সত্ত্বেও কত মানুষ হতাশায় বলে ওঠেন- জীবনটা যেন এক ধূসর পাণ্ডুলিপি। কিন্তু ওঁর কাছে শুধু নিজের জীবন নয়, গোটা পৃথিবীটাই ধূসর। প্রায় ৯০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নেই বছর পঞ্চান্নর সাইদুল মহম্মদের। তবু জীবনীশক্তির অভাব নেই তাঁর। প্যাডেলে চাপ দিয়ে ভ্যান টানেন। ভাগ্যের চাকা না ঘুরলেও পেটের টানে এই বয়সেও ভ্যানরিকশার চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন তিনি।
ইটাহার (Itahar) ব্লকের পতিরাজপুর অঞ্চলের প্রত্যন্ত হেমতপুর গ্রামে সাইদুলের বাড়ি। বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। বুধবার তাঁর খোঁজে গ্রামীণ পথে যেতে যেতেই দেখা মিলল সাইদুলের। মাঝপথে ভ্যান থামিয়ে গল্প জুড়তেই ভিড় জমালেন আশপাশের লোকজন। সাইদুল বলেন, ‘অনেক বছর আগে বাবা এই ভ্যানরিকশা কিনে দিয়েছিল। কী করব? লেখাপড়া তো দূরের কথা, চোখের জন্য অন্য কাজও শিখতে পারলাম না। এই ভ্যান চালিয়েই নিজের জীবন ও সংসার টেনে যাচ্ছি। আমার ভ্যানে যাত্রী ওঠে না। শুধু মাল বহন করি।’
আন্দাজে ভর করেই ভ্যান চালান। পাছে দুর্ঘটনা ঘটে, সেই ভয়ে মানুষ সাইদুলের ভ্যানের যাত্রী হতে চান না। তাই কেবল মালপত্র বহন করেই তাঁর জীবিকা চলে। মাল বহনের জন্য ডাক এলেই আবছা আলো-ছায়ার মধ্যে নির্ভুল পথ চিনে সাইদুল ছোটেন এই গ্রাম থেকে সেই গ্রাম। সাইদুল জানালেন, দৃষ্টি হারিয়েছেন সেই ছোটবেলায়। বয়স তখন সাত-আট। একদিন ধুম জ্বর এল। ইটাহার হাসপাতালে ডাক্তার দেখে বললেন, টাইফয়েড। সাইদুলের মা দলিমন বিবি বলেন, ‘ডাক্তারখানার ওষুধ খেয়ে জ্বর তো ভালো হল। কিন্তু তারপরেই চোখে ধরল জয় বাংলা (কনজাংটিভাইটিস)। সেই রোগেই ওর দৃষ্টিশক্তি চলে গেল।’
প্রতিবেশী আবদুল লতিফের মন্তব্য, ‘সাইদুল কাকাকে এই তল্লাটে, এমনকি সদর ইটাহারেও সকলে চেনে। চোখে দেখতে পান না। কিন্তু আন্দাজ করেই সবখানে চলে যান। রাস্তায় তাঁর ভ্যান দেখলেই অন্য যানবাহনের চালকরা আগেভাগে সাইড দিয়ে দেন। গ্রামের ফসল বাজারে পৌঁছাতে বা অন্য মালপত্র কোথাও নিয়ে যেতে হলে এখনও তিনিই ভরসা।’
কথা হল স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য নইমুদ্দিন রহমানের সঙ্গে। সাইদুলের ব্যাপারে সরকারি সাহাযের প্রসঙ্গ উঠতেই নইমুদ্দিন জানালেন, ‘প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। মাসে হাজার টাকা করে পান। তাঁর স্ত্রীও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পান। কিছু বছর আগে আবাস যোজনার একটা ঘরও দেওয়া হয়েছে।’

