- আশিস ঘোষ
হালে একটা কথার বেশ চল হয়েছে- সেটিং। কাছাকাছি বাংলায়, তলে তলে বোঝাপড়া। বিশেষ করে পলিটিক্সে। এই বাংলায় রাজনীতি এখন দাঁড়িয়ে আছে গোপন সমঝোতার উপরে। কার সঙ্গে কার সেটিং নেই? বামেদের ভাষ্যে বড় সেটিং তৃণমূল আর বিজেপির, কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসকের। অন্যদিকে, তৃণমূলের কথায়, জগাই-মাধাই-গদাইয়ের সেটিং। জগাই, মাধাই, গদাই মানে বিজেপি, বাম আর কংগ্রেস। গত কয়েক বছর ধরে রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে সেটিংকে ঘিরে।
সিপিএম আর কংগ্রেসের ঠেলা অন্যত্র। শুধু বিজেপির বিরুদ্ধে বেশি কথা বললে তৃণমূল আড়ালে চলে যাবে। আবার রাজ্যের নানারকম দুর্নীতি আর অত্যাচার নিয়ে গলা তুললে অ্যাডভান্টেজ বিজেপির। ফলে আম আর ছালা, দুটোই সামলাতে হচ্ছে তাদের। তারা বাজারে ছেড়েছে বিজেমূল তত্ত্ব। তারা বিশেষ করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে শুনিয়ে থাকে, দিল্লিতে একসময় বিজেপির মন্ত্রীসভায় ছিলেন মমতা।
তাদের মোদ্দা কথা, হরেদরে বিজেপি আর তৃণমূল একই ঝাড়ের। তাই এক পোয়া বিজেপিকে গালমন্দ করে বুড়ি ছুঁয়েই তিন পোয়া তৃণমূলের চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করতে হয় আলিমুদ্দিনের পোড়খাওয়া পাকা মাথাদের। তাতে শ্যাম রইল, কুলও। এখন যেখানে যা কিছু হয়, হইহই করে সেটিং বলে মাইক হাতে নেমে পড়েন বাম নেতারা। আরজি করে সেটিং, সন্দেশখালিতে সেটিং, সারদা-নারদায় সেটিং। কোর্টে সেটিং। সর্বত্র সেটিংয়ের ছড়াছড়ি।
এমনকি এই যে ভোটার লিস্ট সংশোধন নিয়ে তুলকালাম চলছে, তাও নাকি গরিবের সমস্যা আড়াল করতে দুই দলের সেটিং। তাদের যুক্তি, বিজেপি চায় না তৃণমূল নবান্ন থেকে হটুক। তাই নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে চালিয়ে যাচ্ছে। সিবিআই, ইডি সব সেটিং। প্রত্যেক ভোটে এই তত্ত্ব বাজারে আনে তারা। যদিও এইসব কথায় যে চিঁড়ে ভেজে না, রেজাল্টের পর তা মালুম হয়। সবই হয়, কেবল জনগণের সঙ্গে সেটিংটা তাদের হয়ে উঠছে না! শূন্য থেকে এক হতে পারল না তারা।
অন্যদিকে তৃণমূলের থিয়োরি মানলে তাদের বিরুদ্ধে আছে বাম-কংগ্রেসের সেটিং। অবশ্য এটাকে ঠিক সেটিং বলা উচিত নয়। কেননা তাদের জোট প্রকাশ্যেই। একসঙ্গে ভোটে লড়ে। অঙ্কে গরমিল হয়ে যায় জগাই, মাধাইয়ের সঙ্গে গদাইকে জুড়তে গেলে। বিজেপির সঙ্গে বাম বা কংগ্রেসের খোলাখুলি জোট অসম্ভব। তলে তলে কিছু হলে তা আমাদের জানার কথা নয়। তৃণমূলের বক্তব্য, হঠাৎ বামের ভোট উবে গেল কী করে। আসলে ওই ভোট গিয়েছে বিজেপিতে। নইলে রাতারাতি পদ্মফুলের ভোট বাড়ল কী করে! সেখান থেকে চালু হয়েছে বামের ভোট রামে যাওয়ার কথাটা।
তৃণমূলের কথায়, সিপিএমের ছক নাকি ছিল আগে জোড়াফুলকে হটাতে পদ্মকে জেতাও। তারপর পদ্মকে সরিয়ে দিয়ে উন্নততর বামফ্রন্টকে ফের গদিতে বসানো যাবে। সেটিং নাকি ছিল বামের ভোট রামে ট্রান্সফারের। এরাজ্যের রাজনীতিতে আদর্শগতভাবে বিজেপি একঘরে। তাদের সঙ্গে অন্য কারও প্রকাশ্যে জোট হওয়ার কথা নয়। অন্য সব দলের ভাষ্যে বিজেপি দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক দল। অতএব বিজেপি বাকিদের নামে সেটিংয়ের অভিযোগ আনতেই পারে।
অবশ্য বাম আর কংগ্রেস এতটাই দুর্বল যে, তার আর দরকার পড়ে না। বিজেপির লড়াই তৃণমূলের সঙ্গে। তৃণমূলেরও তাই। এখন আবার বঙ্গ বিজেপিতে নতুন সভাপতি এসে খোলাখুলি বাম, কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে তৃণমূল বিরোধী জোট গড়ার ডাক দিয়েছেন। তাতে স্বাভাবিকভাবেই কেউ সাড়া দেয়নি। এবার ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে প্রচুর হাঁকডাক করলেও বেজায় প্যাঁচে পড়েছে পদ্ম শিবির। রাজ্যে লাখখানেকের মতো বুথ। তার চল্লিশ পার্সেন্ট বুথে দেওয়ার মতো কর্মী নেই তাদের। তাই ঠেকায় পড়ে বুথ লেভেল জোট করার কথা বলছে তারা। বিজেপি বলছে, ভোটার লিস্ট ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজে তৃণমূল বিরোধী সবাই একত্র হোক। তাতে যে সাড়া মিলবে না, তা বোঝা মুশকিল নয়। এটাকে নতুন সেটিং বা সেটিংয়ের ডাক বলা যায়।
ভোট আসছে। অনেক আগে থেকেই বাজার তেতে উঠেছে এবার। একদিকে বাঙালি অস্মিতা, অন্যদিকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা- মোটামুটি গণ্ডি টানা হয়ে গিয়েছে। এই হাওয়ায় কে কার সঙ্গে সেটিং করবে? ইতিমধ্যে বাঙালি ইস্যু নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছে বাম-কংগ্রেস। এই হাওয়া একা তৃণমূলের পালে লাগবে কেন? দৃশ্যত খানিকটা ব্যাকফুটে দিল্লির দল। এ অবস্থায় ‘আয় ভাই’ বলে বাকি দুই দলকে ডাকা ছাড়া পদ্ম শিবিরের উপায় কী!
তবে কথা হল, তলে তলে আঁতাত করতে গেলেও তো কিছুটা মাটির জোর লাগে। পায়ের নীচে মাটি না থাকলে সেটিং হতে যাবে কেন? হলেও তার ফায়দা কোথায়! আর গোপন বোঝাপড়া হলে তা হবে একেবারে স্থানীয় স্তরে। সেখানে উলটোটা হবে না- এমন কথা কেউ হলফ করে বলতে পারে! মুণ্ডুটা ধড়ের উপর রাখতে হলে লোকাল রাজনীতি সমঝে চলতে হবে বৈকি। সেটাই তো আসলি সেটিং।



