জলপাইগুড়ি ব্যুরো: বিপুল ভোটে জয় হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পদ্ম শিবিরের বিরুদ্ধে সমানে বেলাগাম হওয়ার অভিযোগ। পরিস্থিতি সামলাতে শীর্ষনেতৃত্ব থেকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোথায় কী! সোমবার ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই বিজেপির বিরুদ্ধে গোটা রাজ্যে সমানে সন্ত্রাস চালানোর অভিযোগ উঠতে শুরু করে। রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তের মতো জলপাইগুড়িও (Jalpaiguri) ব্যতিক্রম নয়। কোথাও পদ্ম কর্মীদের বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতার ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ তো কোথাও তৃণমূল নেতাকে দলে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে বিজেপিরই শীর্ষনেতার বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ চলল।
মঙ্গলবার বিজেপির (BJP) কর্মীদের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কৃষ্ণ দাসের অনুগামীদের সংঘর্ষের ঘটনায় কোতোয়ালি থানার বারোপাটিয়া এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। বিজেপির অভিযোগ, কৃষ্ণ ও তাঁর গুন্ডাবাহিনী ধারালো অস্ত্র নিয়ে গেরুয়া কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। তাতে পদ্ম শিবিরের চারজন গুরুতর জখম হন। তাঁদের দুজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় জলপাইগুড়ি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, বিজেপির কর্মী–সমর্থকরা তাঁরা বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন বলে কৃষ্ণের দাবি। ঘটনার খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশ বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আক্রান্ত বিজেপি কর্মীরা জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানায় কৃষ্ণ সহ তাঁর অনুগামীদের নামে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এরপরই অনুগামীদের নিয়ে কৃষ্ণ গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ। রাজগঞ্জ থানার আইসি গাড়ি নিয়ে তাঁদের ধাওয়া করেন। কিন্তু অভিযুক্তদের ধরা যায়নি। কিন্তু অভিযুক্তদের পালাতে সাহায্য করা হয়েছে বলে পরে বিজেপি কর্মীরা টোল প্লাজায় রাজগঞ্জ থানার আইসি-কে ঘিরে বিক্ষোভ দেখান। পুলিশ অভিযুক্তদের খুঁজছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে বলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শৌভনিক মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ঘটনার পর সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। তাতে কৃষ্ণকে ধারালো অস্ত্র হাতে দেখা গিয়েছে। উত্তরবঙ্গ সংবাদ অবশ্য ওই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি।
এদিকে, সোমবার রাতে ওদলাবাড়ি (Odlabari) গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন এলাকায় অশান্তি শুরু হয়। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা সুকান্ত চৌধুরীর ছেলের মোটর সাইকেল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ, বিজেপি সমর্থকদের একাংশ তৃণমূল নেতা সোনু গুপ্তার বাড়িতে হামলা চালালে পালটা আক্রমণ হয়। তাতে ছ’টি বাইক পোড়ানো হয়। একটি মিষ্টির দোকানে ভাঙচুর, লুটপাট ও মারধরের অভিযোগ ওঠে। যদিও সোনুর পালটা দাবি, তাঁর বাড়িতেই প্রথম হামলা হয়েছিল। তৃণমূলের জেলা সাধারণ সম্পাদক তমাল ঘোষের অফিসে হামলা চলে। তাঁর অফিস ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সমস্ত ঘটনা সামাল দিতে শীর্ষ নেতৃত্ব আসরে নামে। মঙ্গলবার ওদলাবাড়িতে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে এসে বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি গোস্বামী দলীয় কর্মীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন। ওদলাবাড়ির বিজেপি কর্মীদের অভিযোগ, বাপি তৃণমূল নেতা তমাল ঘোষের সঙ্গে গোপন বৈঠক করতে এসেছিলেন। তমালকে বিজেপিতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে এরপরই জল্পনা ছড়ায়। বিজেপি কর্মীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান।


মঙ্গলবার সকালে বারোপাটিয়া এলাকার বিজেপির সমর্থকরা বিজয় মিছিলের আয়োজন করেছিলেন। অভিযোগ, মিছিল শেষে বিজেপির সমর্থকদের একাংশ এলাকার কৃষ্ণ অনুগামী তৃণমূল কর্মীদের উদ্দেশ্য করে জয় শ্রীরাম স্লোগান দেন। এতে দু’পক্ষের মধ্যে বচসা এবং হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। সাময়িকভাবে বিষয়টি মিটে গেলেও কিছুক্ষণ বাদে আরও বিজেপি সমর্থকরা একত্রিত হয়ে কৃষ্ণ দাসের বাড়িতে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। খবর পেয়ে কৃষ্ণ তাঁর বাড়িতে অনুগামীদের একত্রিত করে ধারালো অস্ত্র এবং লাঠি নিয়ে পালটা হামলার প্রস্তুতি নেন। বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা এলাকায় কৃষ্ণর বাড়ির এলাকায় পৌঁছালে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়ে যায়।
আক্রান্ত বিজেপি সমর্থক সুধীর রায় বলেন, ‘আমরা কয়েকজন ভ্রামরী দেবীর মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য কৃষ্ণ দাসের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেই সময় কৃষ্ণ এবং তার দলবল ধারালো অস্ত্র এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করেন।’ অন্যদিকে কৃষ্ণের বক্তব্য, ‘আচমকাই আমার বাড়িতে প্রায় হাজার খানেক বিজেপি কর্মী লাঠি এবং ধারালো অস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়। আমাদের কেউ কোনও বিজেপি কর্মীকে মারধর করেনি।’
বাপি এদিন দুপুরে তমাল ঘোষের বাড়িতে যাওয়ার জন্য ওদলাবাড়িতে আসেন। জেলা সম্পাদক রাকেশ নন্দী সহ অন্যরা ছিলেন। সেই খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। নিমেষের মধ্যে ওদলাবাড়ি ট্রাফিক মোড়ে কয়েকশো বিজেপি কর্মী জড়ো হন। সেখানে বাপির গাড়ি আটকে ব্যাপক বিক্ষোভ চলে। তৃণমূলের যে নেতা বিজেপির সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করেছে তাঁকে কেন বিজেপিতে যোগদানের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ ওঠে। ১৭ নম্বর জাতীয় সড়কে বাপি ও রাকেশের কুশপুতুল দাহ চলে।
পরে বাপি বলেন, ‘কিছু তৃণমূল সমর্থক ভোটের ফল ঘোষণার পর গেরুয়া আবির মেখে তাদেরই পার্টি অফিসে আমাদের ঝান্ডা ঝোলাচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছি। বাপি মালবাজারে একটি রেস্তোরাঁয় দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে রাকেশ সেখানে মালের কর্মীদের সঙ্গে বচসায় জড়ান। পরে রাকেশ বলেন, ‘রাজ্য সভাপতির নির্দেশ মতো তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা–কর্মীদের দলে নেওয়া হবে না। আমরা তমালের বাড়িতে যাইনি। ভুয়ো খবর ছড়ানো হয়েছে।’ অন্যদিকে তমালের বক্তব্য, ‘বাপি নিজেই ফোন করে আসতে চাইছিলেন, সেটা আমি জেলা সভাপতি মহুয়া গোপকে জানিয়েছি।’

