পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: গরুমারা জাতীয় উদ্যান এলাকা ইকো সেনসিটিভ জোন হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। এতে একদিকে মাথায় হাত পড়েছে বছরের পর বছর ধরে ওই এলাকাকে ঘিরে থাকা বেসরকারি রিসর্ট, কটেজ মালিকদের। অন্যদিকে, বন ও পরিবেশমন্ত্রকের এই সিদ্ধান্তে বন এবং বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণে নতুন করে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন পরিবেশপ্রেমীরা।
গরুমারার সীমানার বাইরে ১ থেকে ১৭ কিমি পর্যন্ত ইকো সেনসিটিভ জোনের আওতায় পড়ছে। সেখানে রয়েছে জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri News) লাটাগুড়ি, রামশাই, কালামাটি, কাওয়াগাব, মূর্তি, ধূপঝোরা, চালসা, বাতাবাড়ি, বড়দিঘি, নাগরাকাটা, টিলাবন, টিলাবাড়ির মতো এলাকাগুলি। এই এলাকাগুলিতেই গত কয়েকবছর ধরে রিসর্ট এবং কটেজ গড়ে উঠেছে। সেই রিসর্ট, কটেজকে কেন্দ্র করে কয়েক লক্ষ মানুষের সংসার চলে। কেন্দ্রের বন ও পরিবেশমন্ত্রক গরুমারার একটা অংশ ইকো সেনসিটিভ জোনের আওতায় ঘোষণা করায় কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে পর্যটন ব্যবসায়ীদের।
কারণ কেন্দ্রীয় এই মন্ত্রকের নির্দেশ কার্যকর হলে মাল, লাটাগুড়ি, মূর্তি, ধূপঝোরা, বাতাবাড়ি, বড়দিঘি, চালসার মতো এলাকা থেকে সমস্ত সরকারি-বেসরকারি রিসর্ট এবং কটেজকে তুলে দিতে হবে। ডুয়ার্সের এই অঞ্চলের পর্যটনশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তাই জেলা প্রশাসন এবং বন দপ্তরের দ্বারস্থ হওয়ার কথা ভাবছেন ব্যবসায়ীরা। মেটেলি ব্লকের গরুমারা ট্যুরিজম ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাজমল হক জানান, ১৭ কিমি এলাকাজুড়ে ইকো সেনসিটিভ জোন হলে মূর্তি, ধূপঝোরা, বাতাবাড়ি, চালসা, মঙ্গলবাড়ি, টিয়াবন, কোথাও কোনও বেসরকারি রিসর্ট থাকবে না। সরকারি রিসর্টও তুলে দিতে হবে। হতাশার সুরে বললেন, ‘এমনটা সত্যিই হলে আমরা পথে বসে যাব। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি নিজেরা আলোচনায় বসছি। তারপর কীভাবে বেসরকারি পর্যটনশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তার বিকল্প রাস্তা খুঁজতে জেলা শাসক এবং ডিএফও’র দ্বারস্থ হব।’
যদিও কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত বন এবং বন্যপ্রাণীদের জন্য লাভজনক হবে বলে মনে করছে পরিবেশপ্রেমী সংগঠনগুলি। পরিবেশপ্রেমী সংগঠন স্পোরের মুখপাত্র শ্যামাপ্রসাদ পান্ডে বলেন, ‘গরুমারা জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন এলাকায় বড় বড় অট্টালিকা তৈরি হচ্ছে। আমরা অনেকবার প্রতিবাদ জানিয়েও সেসব বন্ধ করতে পারিনি। এবার ইকো সেনসিটিভ জোন নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় আশা করছি, এইসব বন্ধ হবে।’
জলপাইগুড়ি সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের সম্পাদক ডঃ রাজা রাউতের মতে, ইকো সেনসিটিভ জোন মেনেই সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলিতে বেসরকারি এবং সরকারি পর্যটন সহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ন্ত্রিতভাবে রূপায়িত করা হয়ে থাকে। অনেকদিন ধরেই গোরুমারার বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ নিয়ে পরিবেশবান্ধব পর্যটন পরিষেবা চালুর দাবি জানানো হচ্ছে। এবার সেগুলো ইকো সেনসিটিভ জোনের আওতায় কার্যকরী হতে দেখবেন বলে আশা করছেন।
লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব অবশ্য গরুমারার পর্যটনের সঙ্গে জড়িতদের পরিণতির কথা জানালেন। বললেন, ‘লাটাগুড়ি, মূর্তি, ধূপঝোরা এবং রামশাইতে আড়াইশোর মতো বেসরকারি রিসর্ট রয়েছে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে তিন লক্ষেরও বেশি মানুষ এই পেশা থেকে লাভবান হয়ে থাকেন। ১৭ কিমি এলাকাজুড়ে ইকো সেনসিটিভ জোন রূপায়িত হলে বেসরকারি পর্যটন বলে কিছুই থাকবে না।’ ডুয়ার্সের এই অঞ্চলের পর্যটন মূলত জঙ্গলনির্ভর। সেই জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণী বাঁচিয়ে কীভাবে বেসরকারি পর্যটনকে বাঁচিয়ে রাখা যায় সেই রাস্তা খুঁজলে সবারই ভালো হবে।
গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগের ডিএফও দ্বিজপ্রতিম সেন বলেন, ‘ইকো সেনসিটিভ জোনের এলাকা চিহ্নিত হয়েছে। এখন মনিটরিং কমিটি বৈঠকে বসবে। প্রশাসন, পুলিশ, বন দপ্তর, পরিবেশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, পূর্ত, সেচ সহ অন্য প্রতিনিধিদের নিয়ে মনিটরিং কমিটি গঠিত হবে।’ সেই বৈঠকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে ইকো সেনসিটিভ জোনের এলাকা ধরে ধরে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।
জেলা শাসক শামা পারভিনও একই বৈঠকের কথা বলেন। তাঁর কথায়, ‘সরকারি নির্দেশিকা অনুসারে যাবতীয় দিক খতিয়ে দেখা হবে। বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলা হবে।’

