Jalpaiguri | এক কেজি মাটির দাম অন্তত দেড় লক্ষ টাকা

শেষ আপডেট:

পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি, ৮ জুলাই : ঠাকুর রামকৃষ্ণের সেই অমোঘ উক্তি ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’ এখানে আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। জলপাইগুড়ির তোড়লপাড়ায় রাজ্য সরকারের ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যান্ড  ফাইটোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে তৈরি হওয়া বিশেষ মাটি কিনতে ক্রেতাদের খরচ হয় দেড় লক্ষ টাকারও বেশি। সংস্থার গবেষণাগারে তৈরি হচ্ছে এই দুর্মূল্য মাটি। গাছের অনুখাদ্য বা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ হরমোন রয়েছে এই মাটিতে। দার্জিলিং পাহাড় থেকে সমতলেও উন্নত দামি চা উৎপাদনের জন্য এই মাটির চাহিদা এককথায় আকাশছোঁয়া। অথচ, বিপুল বাজার ও তৈরির প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো থাকলেও শুধু সরকারি উদ্যোগের অভাবে এমন মাটির উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না এখানকার গবেষণাগারে।

কীভাবে তৈরি হয় এই মাটি? চিনির কলে আখ নিংড়ে রস বের করার পর আখের ছিবড়ে এক জায়গায় জমা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চিনির কলের যে জায়গায় আখের ছিবড়ে ফেলা হয় সেখানকার মাটি সংগ্রহ করে আনা হয় ফাইটো কমপ্লেক্সে। ফাইটো কমপ্লেক্সের গবেষণাগারের বিশেষজ্ঞ সুভাষ ভৌমিক জানান,  চিনি কলের থেকে মাটি এনে তাকে গবেষণাগারে বিশেষ প্রক্রিয়ায় জারিত করে ট্রায়াকনটানল তৈরি করা হয়। এটি গাছের অনুখাদ্য বা গাছের বৃদ্ধির হরমোন বলা যেতে পারে। এই মাটি পরে জলে গুলে গাছে স্প্রে করলে গাছের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। আখের ছিবড়ের নির্যাস মিশ্রিত মাটি থেকে তৈরি করা এই অনুখাদ্য গাছের বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত দুর্মূল্য জৈব হরমোন। এক কেজি এই ট্রায়াকনটানল বা এই মাটির দাম দেড় লক্ষ টাকারও বেশি।

১০ থেকে ১৫ লিটার জলে ৫০ গ্রাম এই মাটি মিশিয়ে ১ বিঘা জমিতে তিনবার স্প্রে করা যেতে পারে। কৃষি, ফল চাষ ও চা গাছের জন্য এই অনুখাদ্য খুবই প্রয়োজনীয়। আগে বোলপুর ও আহমদপুরের সরকারি চিনি কল থেকে মাটি আনা হত এখানে। এখন এই চিনি কলগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের চিনি কল থেকে মাটি আনতে হচ্ছে। এই মাটি খুব বেশি পাওয়া যায় না। ভিনরাজ্য থেকে মাটি আনার জন্য ট্রায়াকনটানলের দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে।

দার্জিলিং পাহাড়ের অত্যন্ত উন্নতমানের চা তৈরি করে এমন কয়েকটি চা বাগান গাছের অনুখাদ্য হিসাবে এই মাটি কিনে থাকে। কিন্তু উৎপাদন খুব কম হওয়ায় চাহিদানুযায়ী তাঁরা মাটি পান না বলে আক্ষেপ করেছেন টি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার উত্তরবঙ্গের সাধারণ সম্পাদক সুমিত ঘোষ। উত্তরবঙ্গের সমতলেও অনেক বড় চা বাগান এই অনুখাদ্য কিনতে চাইছে। ইন্ডিয়ান টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা অমিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ‘চা গাছ জৈব পদ্ধতিতে বৃদ্ধি করাতে অনেকেই চাইছেন মূল্যবান হলেও এই মাটি কিনতে। কিন্তু চেয়েও মাটি পাওয়া যাচ্ছে না।’

ফাইটোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে এখন বছরে মাত্র ১০ কেজির মতো এই মাটি তৈরি হয়। পরিকাঠামো থাকলেও বিশেষজ্ঞ ও কর্মীর অভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারছে না সরকারি এই প্রতিষ্ঠান। ওয়েস্টবেঙ্গল ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যান্ড ফাইটোকেমিক্যাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট সঞ্জিত গুহ বলেন, ‘মাটি যখন আনা হয় তখন একে সুগার কেন প্রেস মাড বলা হয়। যে মাটিতে আখের ছিবড়ের পচন ধরে সেই মাটি দিয়েই এই অনুখাদ্য ট্রায়কনটানল তৈরি করা হয়। যার বাজারে ১ কেজির  দাম প্রায়  দেড়  লক্ষ টাকা। এই মাটির ৯৯ শতাংশ জৈব অনুখাদ্য। আমরা রাজ্যকে জানিয়েছি, এর উৎপাদন বাড়াতে আরও কর্মীর প্রয়োজন।’

বর্তমানে ফাইটোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ নেই। কয়েক মাসের মধ্যেই সুভাষ ভৌমিক অবসর নেবেন। তারপর ট্রায়াকনটানল তৈরির মতো বিশেষজ্ঞ নিয়োগ না করা হলে এই মাটি তৈরির কাজ অনেকটাই ধাক্কা খাবে। আপাতত গবেষণাগারের একজনকে মাটি তৈরির পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে। সরকারি ফাইটোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে এভাবে জোড়াতালি দিয়ে চলছে গবেষণাগারের কাজকর্ম। বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না সরকারি গাফিলতিতে।

Web Desk
Web Deskhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad is leading online news publisher in West Bengal. Every single article post checked after verify and fact checking by our own staff.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

Rajiv Gandhi Death Anniversary | বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে আবেগঘন রাহুল, রাজীব গান্ধীর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন দেশজুড়ে

উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: আজকের দিনটি ভারতের ইতিহাসের এক...

Artificial Ripening of Mangoes | লাভের আশায় ভরসা কার্বাইডে, অপরিপক্ক আমে বিপন্ন মালদার সুনাম

হরষিত সিংহ, মালদা: পাকার সময় এখনও হয়নি। কিন্তু ভিনরাজ্যের...

Darjeeling Zoo | ভোটের খড়া কাটিয়ে পর্যটকদের ঢল, চেনা ছন্দে দার্জিলিং চিড়িয়াখানা

তমালিকা দে, শিলিগুড়ি: ভোটপর্বের খড়া কাটিয়ে চেনা ছন্দে ফিরছে...

Mahananda river tragedy | মহানন্দায় স্নান করতে নেমে তলিয়ে গেল দুই নাবালক, উদ্ধারকাজে বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ

পুরাতন মালদা: মহানন্দা নদীতে (Mahananda river tragedy) স্নান করতে...