পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: শীতের আমেজ এসেছে, কিন্তু শীতঘুম নেই। অবাক করার মতো হলেও এটাই বাস্তব। ক্যালেন্ডার বলছে, গ্রীষ্ম পেরিয়ে শীতের মরশুম এসেছে রাজ্যে। কিন্তু এখনও দিনেরবেলা অজগর সহ নানা ধরনের সাপ এবং সরীসৃপ প্রাণী অহরহ বেরিয়ে আসছে লোকালয়ে। যে সময় সরীসৃপদের শীতঘুমে থাকার কথা, তখন তাদের এমন অবাধ বিচরণে প্রশ্নের মুখে পড়ছে স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র।
কয়েকদিন আগেই জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) তিস্তাসেতুর কাছে রাস্তার ধারে মৃত অবস্থায় ১২ ফুট লম্বা একটি অজগরকে উদ্ধার করেছিলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মী অঙ্কুর দাস। সেসময় তিনি গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে অজগরের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। শীতের মরশুমে সরীসৃপদের লোকালয়ে চলে আসার ঘটনা মোটেও স্বাভাবিক নয়। এর পিছনে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব ব্যাপক। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শীত শুরু হলেও দিনেরবেলা গরম থাকছে। তাই সরীসৃপদের স্বাভাবিক নিয়মে শীতঘুমে যেতে সমস্যা হচ্ছে। এদিকে বন দপ্তরের দাবি, শীতের দিনের অজগরের বেরিয়ে আসার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বন দপ্তর সূত্রে খবর, ২০২৪ সালে রাজ্যজুড়ে লোকালয়ে বেরিয়ে আসা অজগর, কিং কোবরা সহ অন্যান্য প্রজাতি মিলিয়ে প্রায় ৯ হাজার ৭৩৩টি সাপ উদ্ধার করা হয়। যার মধ্যে উত্তরবঙ্গের লোকালয় থেকেই মেলে ৫৫ শতাংশ। মাসখানেক আগে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অঙ্কুর এর আগে শহরতলি এলাকা থেকে জীবিত অবস্থায় আরও একটি অজগরকে উদ্ধার করেছিলেন। ধারাবাহিকভাবে গরম বাড়তে থাকায় ডুয়ার্সের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশও আর সরীসৃপদের বসবাসযোগ্য থাকছে না বলেই বিশেষজ্ঞদের মত। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে ডুয়ার্সের নাগরাকাটা ও মেটেলির একাধিক লোকালয় ও চা বাগান থেকে চারটি কিং কোবরা ও দুটি অজগর বেরোনোর খবর পাওয়া গিয়েছিল। গত বছর ১৭ মে নাগরাকাটা ব্লকের বামনডাঙ্গা চা বাগান থেকে একটি ১৪ ফুটের অজগর উদ্ধার করেছিলেন খুনিয়া রেঞ্জের বনকর্মীরা।
এখনও কোনওদিন রাতে ঠান্ডা পড়ছে, আবার কোনওদিন তেমনভাবে শীত উপভোগ করা যাচ্ছে না। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশও দিন-দিন কমে আসছে। সরীসৃপদের ওপর যার প্রভাব পড়ছে। তাই অজগর বা পাইথন, কিং কোবরার মতো প্রাণীরা শীতের মরশুমেও লোকালয়ে বেরিয়ে আসছে বলে জানান জলপাইগুড়ি সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের সম্পাদক ডঃ রাজা রাউত। পরিবেশকর্মী অনির্বাণ মজুমদারেরও একই মত। তাঁর কথায়, ‘আমার ধারণা, দিনে গরমের কারণেই সরীসৃপরা নিজেদের আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। এই জাতীয় প্রাণীরা এমনিতেই ঠান্ডা, ভেজা, স্যাঁতসেঁতে জায়গা পছন্দ করে। তাই তেমন জায়গার খোঁজেই প্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসতে পারে।’ পাশাপাশি নীচু এলাকার শুষ্ক জঙ্গলে গাছের পাতা বা আগাছায় আগুন লাগানো হলেও সরীসৃপরা নিজের বাসস্থানের বাইরে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এনিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ওয়াইল্ডলাইফ বোর্ডের সদস্য ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ জয়দীপ কুণ্ডুর মতে, ‘যেভাবে সরীসৃপদের স্বাভাবিক বাসস্থানে মানুষ নির্মাণকাজ শুরু করেছে, তাতে তাদের অসুবিধা হচ্ছে। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার পাশাপাশি নগরায়ণের জন্যও তাদের ক্ষতি হবে।’ অন্যদিকে, গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগের ডিএফও দ্বিজপ্রিতম সেন জানান, গরুমারা ও চাপড়ামারির মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সরীসৃপদের বসবাসের জায়গার কোনও অভাব নেই। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ রয়েছে। জঙ্গলের ভিতর পর্যাপ্ত জলাশয়ও রয়েছে। যদিও অনেক সময় জঙ্গলের লাগোয়া এলাকা থেকে সরীসৃপরা লোকালয়ে হাঁস, মুরগি শিকারের জন্য বেরিয়ে আসে।

