শুভদীপ শর্মা, ময়নাগুড়ি: এই অপেক্ষা শুধু একটা পরীক্ষার নয়, এ যেন ইতিহাস তৈরির অপেক্ষা। জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) জেলার গরুমারা (Gorumara) জঙ্গলঘেরা ময়নাগুড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত জনপদ বুধুরাম বনবস্তি। এ গ্রাম থেকে আজও কেউ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেনি। সেই গ্রাম থেকেই ইতিহাস গড়তে চলেছে এক কিশোরী।
গ্রামেরই এক কৃষক পরিবারের মেয়ে সুমিলা ওরাওঁ এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় (Madhyamik Examination) বসবে। রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতের বুধুরাম বনবস্তি থেকে গরুমারা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে প্রায় প্রতিদিন সাতসকালে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সুমিলা। বাড়ি থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে পানবাড়ি ভবানী হাইস্কুলের ছাত্রী সে।
কেমন লাগে স্কুলে যেতে। বছর পনেরোর মেয়েটা একটু চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘জঙ্গলের রাস্তায় প্রতিদিনই হাতি, গন্ডার বা বাইসন থাকে। অপেক্ষা করি, কখন ওরা সরে যায়। বুক ঢিপঢিপ করে।’ গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা বুধুয়া ওরাওঁ বলেন, ‘এই গ্রাম থেকে আগে কেউ মাধ্যমিক দিতে পারেনি। অভাবই আমাদের সবাইকে থামিয়ে দিয়েছে। তবে আমাদের আশা সুমিলা থামবে না।’
গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর পানবাড়ি ভবানী হাইস্কুলে ভর্তি হয় সুমিলা। সংসারে অভাব থাকলেও পড়াশোনায় কোনওদিন ছেদ পড়েনি। বাবা মঞ্চাল ওরাওঁ ও মা রূপালি দুজনেরই পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল প্রাথমিকের গণ্ডিতে। নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন মেয়ের মধ্যেই দেখতে চেয়েছেন তাঁরা। মঞ্চাল বললেন, ‘আমরা তো পড়াশোনা করতে পারিনি। মেয়েটা যদি পারে, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
স্কুল করার পাশাপাশি পানবাড়িতে একটি টিউশন পড়তে যায় সুমিলা। সকাল সাতটা নাগাদ কোনওদিন খেয়ে, কোনওদিন না খেয়েই বাড়ি থেকে বেরোতে হয়। আগে টিউশন, তারপর স্কুল করে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে যায়। আগে স্কুলের মিড-ডে মিল ছিল ভরসা। এখন বাজার থেকে সামান্য কিছু খেয়ে নেয়।
বনবস্তির মেয়ের এই লড়াইয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন রামশাইয়ের বাসিন্দা ও ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির নারী ও শিশু কর্মাধ্যক্ষ পদ্মমণি রায়। তিনি বলছেন, ‘সুমিলার পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যেতে সবরকম সহযোগিতা করা হবে।’ তবে, এটা বাস্তবে যে কতটা হবে, তা জানেন না বুধুরাম বনবস্তির বাসিন্দারা।
এ গ্রামে বাড়ির উঠোন দিয়ে হেঁটে যায় হাতির পাল। তাই দিনের আলো কমে এলেই দুশ্চিন্তা বাড়ে গ্রামের সকলের। সেই চিন্তা শুধু নিজেদের জন্য নয়। গ্রামের একটা মেয়ের জন্য। সন্ধ্যা নামার মুখে গা-ছমছমে গভীর জঙ্গলের পথ ধরে সুমিলা বাড়ি ফিরবে যে।
রূপালি বলেন, ‘জঙ্গলের রাস্তা নিয়ে ভয় তো থাকেই। তবু ওর পড়াশোনা যেন থামে না—সেইটুকুই চাই।’ লড়াই কতটা কঠিন সুমিলা সেটা জানে। খুব শান্তভাবে সে বলল, ‘ভয় লাগে, কিন্তু পড়াশোনা ছাড়তে চাই না। আমি তো মাধ্যমিক পাশ করে গ্রামের নাম উজ্জ্বল করতে চাই।’

