নীলাচল রায়
আধুনিক বিশ্ব আজ এক অদ্ভুত সময়কালে এসে উপস্থিত হয়েছে। যেখানে বিজ্ঞান ও উন্নত প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে, সেখানে মানুষের অতি ব্যক্তিগত আবেগ ও সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো এখন রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জাপানের মতো উন্নত রাষ্ট্রে জন্মহার বৃদ্ধি এবং বার্ধক্যের দিকে ধাবিত জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল করতে সরকার এখন ডেটিং অ্যাপ বা ম্যাচমেকিংয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি আর্থিক ভরতুকি দেওয়ার পথে হাঁটছে। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে আধুনিক মনে হলেও এর আড়ালে এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র লুকিয়ে আছে, যা নিয়ে বর্তমানে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।
ভালোবাসা বা রোমান্স মূলত মানুষের এক স্বতঃস্ফূর্ত আবেগীয় রসায়ন, যা আর্থিক বরাদ্দ বা বাজেটের মাপকাঠিতে বিচার করা সম্ভব নয়। কিন্তু যখন রাষ্ট্র এই ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গায় ‘ভরতুকি’ নিয়ে প্রবেশ করে, তখন প্রশ্ন ওঠে যে সম্পর্কের এই খরা কি কেবল অর্থের অভাবে, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও গভীর কোনও কারণ? বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্ম যখন যাপিত জীবনের ক্রমবর্ধমান খরচ সামলাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে, তখন প্রেমের জন্য সরকারি অনুদান দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই এক প্রকার করুণ পরিহাস বলে মনে হতে পারে।
বাস্তবতা হল, বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসন খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি সন্তান লালনপালনের ক্রমবর্ধমান খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে কেবল ডেটিং অ্যাপের খরচ বহন করে বা প্রথম সাক্ষাতের বিল মিটিয়ে দিয়ে তরুণদের বিয়ের পিঁড়িতে বসানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। রাষ্ট্র যখন নিম্ন মজুরি, আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয় এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার মতো মূল কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে না, তখন এই ধরনের প্রতীকী বা সাময়িক সাহায্য খুব একটা কাজে আসে না।
এর পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক জীবনের তীব্র মানসিক চাপ ও প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রের ক্লান্তি। দীর্ঘ সময়ের হাড়ভাঙা পরিশ্রম মানুষকে এতটাই অবসন্ন করে ফেলে যে, নতুন কোনও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো মানসিক শক্তি অনেকেরই অবশিষ্ট থাকে না। ফলে একাকিত্ব আজ এক বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিয়েছে এবং মানুষ আজ ভার্চুয়াল জগতে একে অপরের খুব কাছে থাকলেও বাস্তবে অনেক দূরে সরে গিয়েছে। এই একাকিত্ব ঘোচাতে প্রয়োজন এক মানবিক ও সংবেদনশীল সামাজিক পরিকাঠামো, কেবল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ‘সোয়াইপ রাইট’ মানুষের হৃদয়ের শূন্যতা কখনও পূরণ করতে পারে না।
আসলে মানুষের জীবন এবং ভালোবাসা কোনও যান্ত্রিক সমীকরণ নয় যে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করলেই তার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যখন অতিমাত্রায় বেড়ে যায়, তখন সম্পর্কের স্বাভাবিক সৌন্দর্যই হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সস্তা ভরতুকি নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে মানুষ আগামীর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে। রাষ্ট্র যখন নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে, তখন মানুষের মধ্যে সম্পর্কের স্বাভাবিক ইচ্ছা নিজেই ফিরে আসবে।
(লেখক শিক্ষক ও অক্ষরকর্মী)



