নীলাচল রায়
আজকের ডিজিটাল পৃথিবীতে আমাদের সহমর্মিতা বড্ড বেশি ‘ক্যামেরাসর্বস্ব’। বিপন্ন মানুষকে দেখলে হাত সাহায্যের বদলে পকেট থেকে স্মার্টফোন খোঁজে—ভাইরাল হওয়ার নেশায়। কিন্তু গোলার্ধের অন্য প্রান্তে এমন এক দেশ আছে, যেখানে মহত্ত্ব প্রচারের ঢাক পিটিয়ে আসে না। সেখানে এক বোতল জল নিঃশব্দে বুঝিয়ে দেয় প্রকৃত আভিজাত্য কী। সেই দেশ জাপান।
নিঃশব্দে পাশে থাকা
টোকিও বা ওসাকার ব্যস্ত রাস্তায় মাঝেমধ্যে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। কাজ শেষে বা উৎসবের ক্লান্তিতে কেউ হয়তো পার্কের বেঞ্চে বা ফুটপাথে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কোনও পথচারী তাঁকে দেখে থমকে দাঁড়ান না, ভিড় জমান না, এমনকি তিরস্কার করে জাগিয়েও দেন না। বরং অত্যন্ত সন্তর্পণে একটি জলের বোতল ঘুমন্ত ব্যক্তির পাশে রেখে চলে যান। এর পেছনে কোনও এনজিও নেই, কোনও সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি নেই—আছে কেবল এক সুগভীর মানবিক বোধ।
‘ওমোইয়ারি’: মর্যাদার সুরক্ষা
জাপানি সংস্কৃতির মূলে রয়েছে ‘ওমোইয়ারি’ দর্শন। এর সারকথা হল—অন্যের না-বলা প্রয়োজনকে নিজের অনুভব দিয়ে বোঝা এবং কোনও প্রতিদান ছাড়াই সাহায্যের হাত বাড়ানো। অতিরিক্ত মদ্যপান বা ক্লান্তির পর ঘুম ভাঙলে যখন ওই ব্যক্তি প্রচণ্ড তৃষ্ণা অনুভব করবেন, তখন হাতের কাছে জল পাওয়াটা তাঁর কাছে ঈশ্বরদত্ত উপহারের মতো। অথচ তাঁকে বুঝতেও দেওয়া হল না যে তাঁর এই দুর্বল অবস্থা কেউ দেখে ফেলেছে। এখানে সাহায্য আছে কিন্তু করুণা নেই; সেবা আছে কিন্তু দম্ভ নেই। জাপানিরা বিশ্বাস করে, মানুষের ‘লেস্ট পয়েন্ট’ বা দুর্বলতম মুহূর্তকে বিচার করা নয়, বরং তাঁর আত্মমর্যাদা রক্ষা করাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
সহানুভূতির নতুন পাঠ
আমাদের সমাজে আমরা সাহায্য করার চেয়ে প্রচার করতে বেশি ভালোবাসি। ছবি তুলে বা নীতিবাক্য শুনিয়ে অন্যকে ছোট করাই যেন দস্তুর। জাপানের এই ছোট জলের বোতলটি আসলে একটি বৈশ্বিক বার্তা। এটি শেখায় যে শ্রেষ্ঠ সাহায্য সেটাই, যা মানুষের লজ্জা বা আড়ষ্টতা কমিয়ে দেয়। জাপানি জীবনবোধে ‘কাইজেন’ বা নিরন্তর উন্নতির যে ধারণা আছে, এই সামাজিক সহমর্মিতা তারই এক মানবিক বহিঃপ্রকাশ।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশাল আয়োজন বা পাহাড়প্রমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় না; কখনো-কখনো কেবল এক বোতল জল আর এক চিমটি সহমর্মিতাই যথেষ্ট। আজকের বিচারপ্রবণ পৃথিবীতে জাপানের এই ‘নীরব মমতা’র শিক্ষা আমাদের নতুন প্রজন্মের মজ্জায় মিশিয়ে দেওয়া জরুরি। তবেই গড়ে উঠবে এক শান্তিময় ও মর্যাদাপূর্ণ পৃথিবী।
(লেখক শিক্ষক। মাটিগাড়ার বাসিন্দা।)

