উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: গর্ভাবস্থায় জন্ডিস হলে তা অনেকসময় মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে জন্ডিস খুব বিপজ্জনক। তাই গর্ভাবস্থায় জন্ডিস (Jaundice) এড়াতে সচেতনতা জরুরি। লিখেছেন দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাঃ উজ্জ্বল আচার্য।
সাধারণত রক্তে বিলিরুবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ০.২-০.৮ মিলিগ্রাম। গায়ের চামড়ার রং হলুদ হয়ে যাওয়া, চোখের স্ক্লেরা কনজাংটাইভা এবং মিউকাস মেমব্রেন হলুদ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে যদি বিলিরুবিনের মাত্রা ১.২ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটারের বেশি হয় তখন তাকে গর্ভাবস্থায় জন্ডিস বলব। পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, প্রতি হাজার গর্ভবতী মহিলার মধ্যে এক থেকে চারজন জন্ডিসে ভুগে থাকেন।
কারণ
গর্ভাবস্থায় জন্ডিসের কারণ সরাসরি গর্ভাবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। যেমন, ইন্ট্রাহেপাটিক কোলেস্ট্যাসিস, অ্যাকিউট ফ্যাটি লিভার, হেলপ সিনড্রোম, হাইপার এমেসিস গ্রেভিডেরাম গর্ভাবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার ভাইরাল হেপাটাইটিস কিন্তু গর্ভাবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
জন্ডিসের কারণের মধ্যে রয়েছে, ভাইরাল হেপাটাইটিস-এ, ই এবং জি, গলস্টোন, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, হিমোলাইসিস, ইন্ট্রাহেপাটিক কোলেস্ট্যাসিস, হেলপ সিনড্রোম, অ্যাকিউট ফ্যাটি লিভার, গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি এবং সিরোসিস।
উপসর্গ
গায়ের চামড়া, চোখের স্ক্লেরা, কনজাংটিভাইটিস এবং মিউকাস মেমব্রেন হলুদ হয়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি, পেটে ব্যথা, প্রস্রাব হলুদ হয়ে যাওয়া, ক্লান্তি, দুর্বলতা, খাবারে অরুচি, ওজন কমে যাওয়া এবং চুলকানি।
রোগ নির্ণয়
রোগীর উপসর্গ এবং লক্ষণ দেখে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা বিশেষত সিবিসি লিভার ফাংশন টেস্ট, প্লেটলেট কাউন্ট করাতে বলেন। ইউরিন টেস্ট করে ইউরিনে অ্যালবুমিন সুগার বাইল পিগমেন্ট আছে কি না দেখা হয়। সিরাম ভাইরাল মার্কারগুলো নির্ণয় করা হয়। এছাড়া ইউএসজি এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমআরআই করার দরকার হতে পারে।
চিকিৎসা
রোগীকে বিশ্রামে থাকতে হয়। কার্বোহাইড্রেট এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, গ্লুকোজ জল, ফলের রস, মুখে খেতে না পারলে প্রয়োজনে ১০ শতাংশ ডেক্সট্রোজ স্যালাইন, নিয়মিত রক্তপরীক্ষা, পটাশিয়াম গ্লুকোজ এবং ক্যালসিয়ামের মাত্রা নির্ণয় করা দরকার।
প্রসবের সময় হেপাটোটক্সিক ড্রাগ এড়িয়ে চলা উচিত। ইনজেকশন ভিটামিন-কে এবং অক্সিটোসিন ব্যবহার করতে হয় এবং এসময় একজন লিভার বিশেষজ্ঞর তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত।
কতটা বিপদ
মা ও শিশু উভয়ের ক্ষেত্রে জন্ডিস সমস্যা তৈরি করতে পারে। েযমন মায়ের ক্ষেত্রে লিভারের ক্ষতি এবং লিভার ফেলিওর হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। অনেকের স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে, কিডনির ক্ষতি হতে পারে। কারও কারও রক্তক্ষরণ হতে পারে। এছাড়া সিজারিয়ান সেকশনের পরিমাণ বাড়ে। প্রসবের আগে এবং প্রসবের পরে রক্তপাত হতে পারে।
অন্যদিকে, শিশুর ক্ষেত্রে সময়ের আগে জন্ম বা কম ওজনের শিশুর জন্ম, গর্ভপাত, নবজাতকের জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা, গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু এবং নবজাতকের সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রতিরোধের উপায়
এ সময়ে বাইরের খাবার, আঢাকা ও দূষিত খাবার খাওয়া চলবে না।
সময়ে হেপাটাইটিসের টিকা নিতে হবে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, জল নিয়মিত দুই থেকে তিন লিটার খেতে হবে।
নিয়মিত অ্যান্টিনেটাল চেকআপ করতে হবে, প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
খাবার খাওয়ার আগে হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে।
তেল-মশলাদার, চর্বি জাতীয় ও ভাজা খাবার খাওয়া চলবে না।
রক্ত পরীক্ষার সময় ও রক্তদানের সময় জীবাণুমুক্ত করা সূচ ব্যবহার করতে হবে।
ডাক্তারবাবুর পরামর্শে ফলিক অ্যাসিড বড়ি খেতে হবে।
খাদ্যতালিকায় নিয়মিত ফলমূল ও সবুজ শাকসবজি রাখতে হবে।
কী খাবেন
এই সময় পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়া জরুির। ফলের মধ্যে আপেল, কমলালেবু ও তরমুজ খেতে পারেন। সবজির মধ্যে পালংশাক, গাজর, িবট খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া কমলালেবুর রস খেতে পারেন। আখের রস খুব উপকারী। ভুট্টা, ওটস ও অন্যান্য গোটা শস্য লিভারের জন্য খুব উপকারী।
কী খাবেন না
চর্বি জাতীয় খাবার, ভাজাভুজি, অতিরিক্ত তেল-মশলাদার খাবার, বেশি চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার, অতিরিক্ত লবণযুক্ত, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড, কাঁচা লবণ, রেড মিট ও অতিরিক্ত প্রোটিন জাতীয় খাবার খাবেন না। মদ্যপান এড়িয়ে চলুন।

