নৃসিংহপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, কুমারগ্রাম: ওঁরা কেউ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কারও গ্রিলের ব্যবসা, কারও আবার চায়ের দোকান। ভিন্ন পেশার মানুষ হলেও একটি ক্ষেত্রে ওঁদের মনের মিল রয়েছে। গ্রামের কেউ মারা গেলে যাবতীয় কাজ ফেলে ছুটে যান শ্মশানে। দেহ সৎকারের দায়িত্ব তুলে নেন নিজেদের কাঁধে। কুলকুলি নদীপাড়ে জয়দেবপুর কুমারগ্রাম (Kumargram) সৎকার সমিতির পথ চলা শুরু হয়েছিল দেশ স্বাধীনের আগে। শবদাহে পেশাদার শ্মশানকর্মী বা ডোম গ্রামে নেই। তাই আগ্রহী গ্রামবাসীদের একাংশ সৎকার সমিতি গড়ে শ্মশান কালীপুজো এবং মৃতদেহ সৎকারের কাজ করে চলেছেন নিঃস্বার্থে। তাঁদের মধ্যে রমেন গঙ্গোপাধ্যায়, সুব্রত ধরচৌধুরীর মতো অনেকেই গত হয়েছেন। পুরোনোদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে এসেছেন দেবব্রত নন্দী, বিশ্বজিৎ রায়দের মতো অনেকেই।
তাঁদের মধ্যে প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সত্তরোর্ধ্ব শ্যামল ধরচৌধুরী জানালেন, কাকা নৃপেন ধরচৌধুরীর কাছে ছাত্রাবস্থায় চিতা সাজানোর কাজে হাতেখড়ি তাঁর। শবদাহের যাবতীয় কৌশল রপ্ত করেছেন। ১৯৭০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজারের বেশি দেহ সৎকার করেছেন। শুরুর দিকে সিনিয়ার হিসেবে কাকা ছাড়াও ভবতরণ গঙ্গোপাধ্যায়, মাখন মুখোপাধ্যায়দের পেয়েছিলেন। তাঁদের কেউই এখন আর বেঁচে নেই। অতীতে শ্মশানঘাটে শেড, পাকা চুল্লি কিছুই ছিল না। বৃষ্টি-বাদলের দিনে শবদাহে প্রচণ্ড বেগ পেতে হত। হালে অবশ্য শেড, পাকা চুল্লি হয়েছে। তবুও বেশকিছু পরিকাঠামোগত খামতি রয়েছে। শ্যামলের সংযোজন, ‘দেবব্রত, বিশ্বজিৎরা এখন এই কাজের যোগ্য উত্তরসূরি। মন চাইলেও হার্টের অপারেশনের পর শরীর সঙ্গ না দেওয়ায় বছর দেড়েক হল সৎকার থেকে অবসর নিয়েছি।’


কুমারগ্রাম বাসস্টপের কাছে চায়ের দোকান দেবব্রতর। বললেন, ‘১৯৮৬ সাল থেকে শ্মশানে যাচ্ছি। সাতশোর বেশি দেহ সৎকার করেছি। এখনও এই কাজ করে যাচ্ছি। শবদাহের জন্য কতটা পরিমাণ জ্বালানি কাঠ দরকার? কীভাবে চিতা তৈরি করলে মাঝপথে হেলে যাবে না এসব কায়দা কৌশল শ্যামল মাস্টারমশাইয়ের কাছেই শিখেছি। বলতে গেলে এই সামাজিক কাজে উনি আমাদের গুরু। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওনাকে শ্মশানে যেতে দিই না। আমরাই সামলে নিচ্ছি।’ দেবব্রত জানালেন, এই কাজের পাশাপাশি প্রায় দু’দশক বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে খাবার পরিবেশনও করেছেন। গ্রামে কারও বাড়িতে অনুষ্ঠান হলেই তাঁদের ডাক পড়ত। এখন অবশ্য কেটারিং সিস্টেম চালু হওয়ায় সেই কাজ থেকে তাঁদের অব্যাহতি মিলেছে।
গ্রিল ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ ১৯৯৫ সাল থেকে শবদাহের কাজ করছেন। তাঁর মন্তব্য, ‘এই কাজে আত্মীয়-অনাত্মীয় বিচার্য নয়। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বড় বিষয়। এতে মানসিক শান্তি পাই।’

