অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ: সিনেমা বা সিরিজে পৌরাণিক আমলের যুদ্ধ তো নিশ্চয়ই সকলেই দেখেছেন। সেখানে একটা জিনিস প্রায় সবক্ষেত্রেই দেখা যায়, আর সেটা হল বর্ম। যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের মাথা বাঁচাতে প্রায় সমস্ত সৈন্যই ওই জিনিস ব্যবহার করে থাকেন। এর কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে কি না, সেই নিয়ে তর্ক থাকতে পারে। কিন্তু শীতের সঙ্গে লড়াইয়ে কার্যত এরকমই এক জিনিস কিছু বছর আগেও বাঙালির জীবনে ছিল অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। হনুমান টুপি বা মাঙ্কি ক্যাপ। এমনকি এখনও প্রায় সব বাড়ির ট্রাংকেই শীতের জামাকাপড়ের সঙ্গে খুঁজলে ওই জিনিস নির্ঘাত পাওয়া যাবে। কিন্তু নতুন প্রজন্ম এখন এইভাবে টুপি পরে হনুমান হতে মোটেও রাজি নয়।
ডিসেম্বরের শুরুতেই মিলছে কনকনে ঠান্ডার পরশ। উত্তরের শীতল হাওয়ার ভেলকিতে পারদ ক্রমশ নিম্নমুখী। ফলে, শীতকাতুরে বাঙালির আলমারি থেকে বেরিয়ে এসেছে ন্যাপথলিনের গন্ধ মাখা শীতবস্ত্র। সোয়েটারের পাশাপাশি মাথা, গলা ঢাকতে বেরিয়ে এসেছে হনুমান টুপিও৷ ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৮৫৪ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ থেকে ব্যালাক্লাভা নামটির উৎপত্তি। ছবি দেখলেই বোঝা যাবে ব্যালাক্লাভা আসলে বাংলার আদি-অকৃত্রিম হনুমান টুপি। অনুমান, ব্রিটিশদের থেকেই এই টুপির মাহাত্ম্য বুঝেছিল মানুষ। শুরু হয়েছিল ব্যবহার।
কালিয়াগঞ্জের (Kaliaganj) স্কুলপাড়ার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক চন্দন চক্রবর্তীর কথায়, ‘প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে মাঙ্কি টুপি ব্যবহার করছি৷ ঠান্ডা থেকে রেহাই পেতে এ এক অবিস্মরণীয় আবিষ্কার৷ আমার দুটো মাঙ্কি টুপি রয়েছে। শীত পড়লেই আলমারি থেকে সেগুলো বের করি।’ সত্যজিৎ রায় তাঁর সোনার কেল্লা সিনেমাতেও কেন্দ্রীয় চরিত্র মুকুলকে মাঙ্কি টুপি পরিয়েছিলেন। বাঙালির প্রতীক হিসাবে বাংলায় মাঙ্কি টুপি চিহ্নিত হয়েছে চিরকালই। কালিয়াগঞ্জের চিড়াইলপাড়ার বাসিন্দা লিপি সরকার বলেন, ‘আমার তিন বছরের ছেলে রোহিতকেও মাঙ্কি টুপি পরাই। স্কুলেও সে শীতকালে ইউনিফর্মের সঙ্গে ম্যাচিং মাঙ্কি টুপি পরে যায়। বাড়িতে শ্বশুরমশাইও শীতকালে মাঙ্কি টুপি পরেন৷ তবে, আমার কর্তা আবার মাঙ্কি টুপি পরতে খানিকটা লজ্জা বোধ করেন।’
শুধু লিপির স্বামী নয়, বর্তমানে এমনিতেও মাঙ্কি টুপির প্রচলন যথেষ্ট কমেছে। মাথা, মুখ ও গলা ঢাকার নিত্যনতুন পোশাক ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে অনেক বেশি। কলেজ পড়ুয়া বিক্রমাদিত্য সাহার কথায়, ‘মাঙ্কি টুপি পরে বাইরে বন্ধুবান্ধবদের মাঝে গেলে ওদের কাছে হাসির খোরাক হব আমি। এখন কত আধুনিক ধরনের টুপি, মাফলার বেড়িয়েছে। সেগুলোই কিনে ব্যবহার করি৷ ছোটবেলায় মা অবশ্য জোর করে মাঙ্কি টুপি পরিয়ে দিত।’
আধুনিকতার ছোঁয়ায় জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে মাঙ্কি টুপি। বস্ত্র ব্যবসায়ীরাও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোকানে মাঙ্কি টুপির বরাদ্দ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন। শহরের এক বস্ত্র ব্যবসায়ী বিদ্যুৎ সাহার কথায়, ‘দুই বছর ধরে দোকানে প্রায় আটটি বড়দের মাঙ্কি টুপি পড়ে রয়েছে। বিক্রি প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছে। তুলনায় বাচ্চাদের মাঙ্কি টুপির এখনও বিক্রি রয়েছে। এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় টুপি, গলবন্ধক, মাফলার বেড়িয়েছে। এগুলো বিক্রিও যথেষ্ট ভালো।’

