অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ: নববধূর গাড়ি এগিয়ে চলেছে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে। সামনে পুড়ছে বাজি। নিঃশব্দ ভাঙছে নিষিদ্ধ শব্দবাজি। তার পিছনে সমস্ত ডেসিবেলের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বাজছে ডিজে। যথারীতি এমন পরিস্থিতিতে চলার পথ না পেয়ে নববধূর গাড়ির পিছনে আটকে প্রচুর মানুষ, খুঁজছেন চলার একটু পথ। প্রত্যেকেই বিরক্ত। সাউন্ড সিস্টেমের কানফাটা আওয়াজে অধিকাংশ বাড়িতে বন্ধ হচ্ছে জানলা-দরজা। কিন্তু ঘরের মধ্যে থেকেও পঠনপাঠনে মনোনিবেশ করতে পারছে না মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বা অন্য ক্লাসের পড়ুয়া। অগ্রহায়ণ মাস শুরু হতেই এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি কালিয়াগঞ্জ (Kaliaganj) শহরে।
এখন সর্বত্র বিয়ের অনুষ্ঠান। বিয়ে থেকে বধূবরণ, বর ও কনের প্রতিটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এখন আরও এক উৎসব। কিন্তু এমন উৎসবে শামিল এক শ্রেণির মানুষের কাণ্ডে অতিষ্ঠ শহরের সিংহভাগ মানুষ। দুয়ারে যে স্কুলগুলিতে বার্ষিক পরীক্ষা রয়েছে, বেশি দেরি নেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার, সে খেয়াল নেই কারও। নিজেদের নিছক আনন্দ-ফুর্তির ক্ষেত্রে অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন পাশের বাড়ির ছেলেমেয়েটির পরীক্ষার কথা, সমস্যায় পড়ছেন পাড়ার সহ নাগরিকরাও। অতিষ্ঠ অভিভাবকদের অভিযোগ, কালীপুজোর আগে নিষিদ্ধ শব্দবাজির বিরুদ্ধে অভিযান চলে পুলিশের। কিন্তু পরবর্তীতে আর নজরদারি থাকে না। ফলে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ শব্দবাজি। শব্দদানবের তাণ্ডব বন্ধেও প্রশাসন নিরুত্তর। কালিয়াগঞ্জ থানার আইসি দেবব্রত মুখোপাধ্যায় অবশ্য বলছেন, ‘বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’
এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ অভিভাবক শান্তনু সাহা বললেন, ‘মেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। রাতে পড়তে গিয়ে সমস্যায় পড়ছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে মেয়ে। আজ যাঁরা কার্যত জ্ঞানশূন্য হয়ে শব্দবাজি পোড়াচ্ছেন বা মদত দিচ্ছেন, মেয়ে ভালো ফল করলে তাঁরাই শুভেচ্ছা জানাতে বাড়িতে হাজির হবেন।’ প্রতি বছর পরীক্ষার আগে এমন অত্যাচারের বিরুদ্ধে কেন জোটবদ্ধ হয়ে স্কুলগুলি প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। কালিয়াগঞ্জ সরলা সুন্দরী উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক সঞ্জিতকুমার দত্তের বক্তব্য, ‘গত বছর শব্দদানবের বাড়বাড়ন্ত রোখার ক্ষেত্রে আমরা কালিয়াগঞ্জ থানা এবং কালিয়াগঞ্জ পুরসভাকে চিঠি দিয়েছিলাম৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রশাসনের তেমন কোনও ভূমিকা দেখিনি। অভিভাবকদের প্রস্তাব অনুযায়ী শহরের সমস্ত স্কুল মিলে আবার প্রশাসনকে এব্যাপারে লিখিত অভিযোগ জানানোর চেষ্টা করব।’
শহরের প্রতিটি অনুষ্ঠান ভবনই জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। কয়েকটি ভবনে রাতভর হুল্লোড় চলার পাশাপাশি নিষিদ্ধ শব্দবাজি পোড়ানো হয় বলে অভিযোগ। স্টেশন রোড এলাকার বাসিন্দা গৌতম ভদ্রের কথায়, ‘দীর্ঘদিন ধরে অধিক রাত পর্যন্ত ভবনে শব্দদানবের তাণ্ডব চলছে। অসুস্থ মায়ের বয়স ৯০ বছর। বিষয়টি ভবনের কর্মীদের জানালেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। প্রশাসনকে জানালেও কোনও কর্ণপাত করে না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালিয়াগঞ্জের এক মাইক ব্যবসায়ীর সাফাই, ‘লক্ষাধিক টাকা বিনিয়োগ করে তো পেটে গামছা বেঁধে থাকব না। বিয়েবাড়িতে সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দিয়ে রোজগার হয়।’ কালিয়াগঞ্জ পুরসভার চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ কুণ্ডু বললেন, ‘কালিয়াগঞ্জ থানার সঙ্গে দ্রুত কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’

