অনুপ সাহা, ওদলাবাড়ি: বসন্তের এখনও দেরি, তবে নভেম্বর তো এসে গিয়েছে। আর তাতেই গোলাপি, লাল আর সাদা ফুলে সাজতে শুরু করেছে কালিম্পং (Kalimpong) জেলার পাহাড়ি গ্রাম সামাবিয়ং (Samabeong)। আবহাওয়ার বিরূপতায় দিন কয়েক দেরিতে হলেও, ফের একবার রঙিন চেরি ফুলের ডালি সাজিয়েছে ঝান্ডি থেকে লাভা যাওয়ার পথে সামাবিয়ং টি এস্টেট।
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চেরি ফুল ফোটার এই সময়টাকে ‘চেরি ব্লসম’ বলা হয়। বাস্তবে চেরি ব্লসম বলতে জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার নাম মনে এলেও ভারতের শিলং, দক্ষিণ সিকিমের টেমি টি গার্ডেন এবং কালিম্পং জেলার সামাবিয়ং টি এস্টেট গত কয়েক বছরে চেরি ব্লসমের জন্য পর্যটকদের নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
কালিম্পং জেলার আলগাড়া-২ ব্লকের সামাবিয়ং টি এস্টেটের সবুজ পাহাড়ি ঢালে এখন দ্যূতি ছড়াতে শুরু করেছে গোলাপি চেরি ফুল। এই ফুলের সৌন্দর্য, রং এবং অল্প কয়েকদিনের জন্য এর প্রকাশ, এককথায় একে অনন্য করে তুলেছে। পর্যটকদের কাছে চেরি ফুলের হালকা গোলাপি রংয়ের অপরূপ সৌন্দর্য প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধনের অনুভূতি দেয় বলেই জাপানে প্রতিবছর চেরি ব্লসম ফেস্টিভাল ‘সাকুরা’ দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক হাজার মানুষ জাপানে পাড়ি দেন। ভারতেও উত্তর-পূর্বের শিলংয়ে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে চেরি ব্লসম ফেস্টিভাল চালু হয়েছে। সেখানেও দেশবিদেশের পর্যটকদের সংখ্যা নেহাত কম নয়।
চেরি ফুলের অপার সৌন্দর্যের আধার কালিম্পংয়ে এখনও এমন কোনও উৎসবের আয়োজন হয় না। তাই কার্যত আড়ালে থাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬৫০০ ফুট উচ্চতায় ছবির মতো সুন্দর সামাবিয়ং চা বাগান যেন রূপকথার দেশ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রোশন রাই বলেন, ‘এ বছর নভেম্বরের শুরুতে টানা বৃষ্টিতে কিছুটা দেরি হয়েছে বটে, তবে তারপর থেকে চড়া রোদ ওঠায় চেরি ফুলের পাপড়িগুলো যেন ডানা মেলতে শুরু করেছে।’ পবনদীপ মুখিয়া নামে স্থানীয় এক তরুণ বলেন, ‘ভোরে সূর্যের আলো যখন চেরি ফুলের পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরের ওপর এসে পড়ে, সেই দৃশ্য বর্ণনাতীত। যে কয়েকজন হাতেগোনা পর্যটক আসেন, তাঁরা এই দুর্লভ অভিজ্ঞতা নিয়ে যান।’
২৫-৪০ ফুট উচ্চতার একেকটি চেরি গাছে নভেম্বরের শুরু থেকেই ফুল ফুটতে শুরু করে। তার কোনওটির রং লাল বা সাদা। তবে বেশিরভাগই হালকা গোলাপি রংয়ের। মোটামুটি ২০ দিন ধরে চলে ফুল ফোটার পালা। এই সময় ঝান্ডি থেকে শেরপাগাঁও হয়ে লাভা যাওয়ার পথে সারি সারি গাছে গোলাপি রংয়ের হাতছানি উপভোগ করে এই পথে আসা পর্যটকদের দল। ঝান্ডির এক রিসর্ট মালিক রাজেন প্রধান বলেন, ‘এই সময় যাঁরাই ঝান্ডি, লাভায় বেড়াতে আসেন তাঁদের আশপাশের জায়গা ঘোরানোর জন্য সামাবিয়ং নিয়ে যেতেই হয়।’ শুভম পোদ্দার নামে আর এক রিসর্ট মালিক জানালেন, বলিউডের বহু ছবিতে ফুলে ঢাকা চেরি গাছের নীচে বা আশপাশে নায়ক-নায়িকার রোমান্সের দৃশ্য দেখে উৎসাহী পর্যটকরা, বিশেষ করে উঠতি বয়সের যুগলরা সামাবিয়ংয়ে এসে রিলস, ভিডিও বানাতে শুরু করেছেন।’
এত আয়োজন থাকলেও তার দর্শক আনতে রাজ্য সরকার বা জিটিএ কেউই এখনও সুনির্দিষ্ট কোনও পরিকল্পনা করেনি। জিটিএ’র পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাসদ (কাউন্সিলার) নরদেন শেরপা বলেন, ‘জিটিএ’র তরফে পর্যটনের প্রসারে বিশেষ করে অফবিট ডেস্টিনেশনগুলোকে প্রচারে আনতে লাগাতার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সামাবিয়ং টি এস্টেটের চেরি ব্লসম নিয়েও আমাদের ভাবনাচিন্তা রয়েছে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় আগামীদিনে সেখানে চেরি ব্লসম ফেস্টিভাল আয়োজন করা হবে।’
রাজ্য পর্যটন দপ্তরের উত্তরবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক জ্যোতি ঘোষ বলেন, ‘কালিম্পং জেলার ওই এলাকায় পর্যটনের প্রসারে রাজ্য সরকার লাগাতার পরিকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজ করে চলেছে। যার ফলে লাভা, ঝান্ডি প্রভৃতি এলাকায় পর্যটকদের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। তবে বিশেষ করে চেরি ব্লসম ফেস্টিভাল আয়োজন করা নিয়ে এখনও পর্যন্ত পর্যটন বিভাগের তরফে কোনওরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’

