ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার: ঠিক না বেঠিক? আলিপুরদুয়ারের(Alipurduar) কালজানি নদীকে কেন্দ্র করে এই প্রশ্নই জোরালো হয়েছে। কালজানির বায়ো–কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি)-এর ওপর ভিত্তি করে কয়েক বছর আগে এই নদীকে দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে ওই ঘোষণার মাত্র সাত–আট মাস পরেই ফের এই নদীকে দূষণমুক্ত বলে কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রক ঘোষণা করে। কালজানির(Kaljani) জল রিজার্ভ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আদৌ কি এই জল পানের যোগ্য? সেটাই এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন।
কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক তথা বিশিষ্ট নদীবিশেষজ্ঞ পিয়াল বসু রায় বললেন, ‘একটি নদীর দূষণ চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে বিওডি অন্যতম মাপকাঠি। কালজানির নিম্নাংশ এখনও মারাত্মক দূষিত। সেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করে কীভাবে এই নদীকে দূষণমুক্ত ঘোষণা করা যায় তা বুঝতে পারছি না। আলিপুরদুয়ারকে বাঁচাতে গেলে কালজানিকে দূষণমুক্ত করতে হবে।’ উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী অনিমেষ বসুর কথায়, ‘ভুটানের পাশাখা শিল্পাঞ্চলের দূষণে ১৭টি দূষিত নদীর তালিকায় কালজানি রয়েছে। এছাড়াও নদীর দু’পাশজুড়ে উন্মুক্ত শৌচকর্ম, গোরু–মোষকে স্নান করানো, গবাদিপশুর মৃতদেহ, চাষবাসের রাসায়নিক- সব কিছুই এই নদীতে মেশে। তাহলে কী করে এই নদীকে দূষণমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হল সেই বিষয়টি সামনে আনা উচিত। পাশাপাশি, কালজানিকে দূষণমুক্ত করতে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’


কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রক সূত্রে খবর, বিওডি-র ওপর ভিত্তি করে জাতীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ২০১৮ সালে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে রাজ্যের ১৭টি নদীর বিশেষ অংশকে দূষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই সময় আলিপুরদুয়ারের কালজানিও ওই তালিকায় ছিল। নদীতে অস্বাভাবিকভাবে অক্সিজেনের কমে যাওয়া, জীবজন্তুর মৃতদেহ ফেলা, আবর্জনা, মলমূত্র ত্যাগ সহ কলকারখানার দূষিত পদার্থ মেশাকে নদীকে দূষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দূষিত হিসাবে চিহ্নিত নদীগুলিকে নিয়ে দ্রুত অ্যাকশন প্ল্যান বানাতে হবে বলে ওই সময় ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবিউনাল এক নির্দেশে জানায়। অন্তত ছয় মাসের মধ্যে যাতে নদী স্নানযোগ্য ও ব্যবহার উপযোগী হয় তার একটি রিপোর্ট দেওয়ার কথাও বলা হয়।
২০১৯ সালের ২১ জুন রাজ্যের মুখ্যসচিব একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। সেখানে ২৪ জনকে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি তৈরি হয়। গ্রিন ট্রাইবিউনালের নির্দেশ অনুযায়ী দূষিত কালজানি নদীকেও দূষণমুক্ত করে পুনরুদ্ধারে রাজ্যের কমিটি কাজ করবে বলে ঠিক হয়। এই কমিটিই ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্লেষণ ও সমীক্ষা করে। তবে ওই কমিটিতে কারা ছিলেন তা নদী বিশেষজ্ঞদের কাছে স্পষ্ট নয়। কমিটি পরে কালজানি নদীর আলিপুরদুয়ারের অংশবিশেষকে দূষণমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করে। ওই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। নদী বিশেষজ্ঞদের দাবি, যে সময় কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রক ওই রিপোর্ট তৈরি করে তখন করোনার সময় ছিল। স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত জায়গায় দূষণের মাত্রা কম ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই রিপোর্ট কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে পরিবেশকর্মী রাতুল বিশ্বাসের মতো অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে।

