অশান্তির পৃথিবী

শেষ আপডেট:

জীবন যেন প্রযুক্তির দাস। মানুষ খুন করতে এখন আর শুধু পেশিশক্তি বা লোকবলের প্রয়োজন হয় না। উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই হল। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়েছে প্রযুক্তির কারসাজিতে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠেকিয়ে রাখা গেলেও থার্মাল ইমেজিং সিঁধ কেটে ঢুকে পড়েছিল তাঁর দপ্তর ও আশপাশের এলাকায়। ইরানের শীর্ষনেতার নিঃশ্বাস ধরে ফেলে আমেরিকা-ইজরায়েল বাহিনীর হাতে থাকা থার্মাল ইমেজিং।

তারপর খামেনেইয়ের জীবনবায়ু বের করে নেওয়া ছিল কয়েক মিনিটের অপারেশন। লুকোনোর চেষ্টা করেও রেহাই মিলল না। প্রযুক্তি ঠিক হদিস দিয়ে দিল তাঁর। যতই নিরাপত্তার বেষ্টনী কিংবা সুরক্ষা দেওয়ার মতো লোকবল থাক, মানুষের প্রাণ এখন প্রযুক্তির হাতের মুঠোয়। সেখানে পার পাওয়ার জো নেই। মানুষের কল্যাণের পাশাপাশি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে ধ্বংসাত্মক কাজে। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার যতই উন্নতি হোক, চেতনা এখনও মধ্যযুগীয়। যেখানে প্রতিহিংসাপরায়ণতা মানুষের জীবন কাটতে দ্বিধা করে না।

এই একুশ শতকে এসে তাই সভ্যতার প্রকৃত বিকাশ আদৌ হল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকেই। সভ্যতার উন্নতিতে মানুষের জীবন অনেক সুস্থির, শান্তিপূর্ণ হবে- এটাই ছিল প্রত্যাশিত। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গত দেড় শতকেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীজুড়ে যুদ্ধ নাই, শান্তি চাই বলে যে স্লোগান উঠছিল- তার বাস্তবায়ন যে হয়নি, তা প্রমাণিত হয়ে গেল। খামেনেই নিঃসন্দেহে স্বৈরশাসক।

সভ্যতা ও সমাজের মানসিকতাকে পশ্চাৎপদ করে তোলার পিছনে তাঁর ঘৃণ্য ভূমিকা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু একুশ শতকে এসে যখন মৃত্যুদণ্ড বিরোধী মানসিকতা পৃথিবীর দেশে দেশে জোরালো হয়ে উঠছে, তখন খুন করাই একমাত্র বিকল্প হতে পারে না। সর্বোচ্চ শাস্তি মানেই মৃত্যু- এই ধারণাটি অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। খামেনেইয়ের নিকেশ আমেরিকা-ইজরায়েলের পাশাপাশি ইরানের বাসিন্দাদের উল্লসিত করেছে সন্দেহ নেই।

কার্যত খামেনেইয়ের নেতৃত্বে স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির উচ্ছ্বাস ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। জনমত ও সভ্যতাকে পিছনে টেনে রাখার পরিণাম এমনই হয়। যদিও খামেনেই নেই মানে স্বৈরশাসন খতম হয়ে গেল- এমন ধারণা এখনই করা উচিত হবে না। এটা যদি হয় ঘটনাক্রমের একটি দিক, অন্যদিকটি তবে আমেরিকার আরও নির্দিষ্ট করে বললে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব। একের পর এক যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে মার্কিন ভূমিকা সেই মনোভাবকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।

ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা যে কোনও দেশের নিজস্ব বিষয়। শাসক বদল হবে কি না, তা ঠিক করার এক্তিয়ার সেদেশের মানুষের। দেশের ও শাসনের অবস্থা অনুযায়ী মানুষ ঠিক করবেন ভোটের মাধ্যমে বা জোর করে শাসককে অপসারণ করা হবে কি না। বলপ্রয়োগ করলেও তা হত্যার মতো নৃশংস স্তরে নিয়ে যাওয়া একান্ত বাধ্য না হলে কাম্য নয়।

ভেনেজুয়েলার মানুষের মতামতের তোয়াক্কা না করে ট্রাম্প বাহিনীর সেদেশের শাসককে অপহরণ সার্বভৌমত্বের ওপর বড় আঘাত এবং আন্তর্জাতিক বিধি ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেওয়ার শামিল। তেমনই হামাস জঙ্গিবাহিনী বলে গোটা প্যালেস্তাইনকে হিংসার স্রোতে ডুবিয়ে দেওয়া একেবারেই বাঞ্ছনীয় নয়। যার খেসারত দিতে হল লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ, নারী-শিশুকে। পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে উঠছে বলে ইরানের ওপর আঘাত কোনও দেশের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়ার শামিল।

ঠিক এই যুক্তিতে কখনও ভারতের ওপর মার্কিন আঘাত নেমে আসবে না- এই নিশ্চয়তা কে দিতে পারে! দেশগুলির সম্পর্ক যদি পারস্পরিক মর্যাদা ও সহাবস্থানের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে এমন অন্যায় যুদ্ধের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। রাজা-রাজড়াদের আমলে যেভাবে অন্যের ভূখণ্ড দখল ছিল যুদ্ধের উদ্দেশ্য, ট্রাম্প পৃথিবীকে কার্যত সেই পথে নিয়ে যেতে চাইছেন। ফলে যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই স্লোগান প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। অশান্তিই হয়ে উঠেছে ভবিতব্য।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

চাপের নতুন ফ্রন্ট

দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে, চাপের মুখে বাংলায় নিজেদের...

নজিরবিহীন

জাতির উদ্দেশে ভাষণের ঐতিহাসিক পরম্পরায় বিরাট ধাক্কা লাগল সন্দেহ...

স্বস্তিতেও প্রশ্ন

ভারতে সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ বিরল নয় ঠিকই।...

ভোটের ভাষ্য

প্রতিশ্রুতি ছাপিয়ে প্রহারের বয়ান। রাজনৈতিক নয়, ভোটের ভাষ্য হয়ে...