Kurseong | গোর্খা তৃষ্ণার মেঘ কার্সিয়াংয়ে, ২০২৬-এর ভোটে উন্নয়ন নাকি আবেগ?

শেষ আপডেট:

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, কার্সিয়াং: ‘খেঁন্দ্র অনি বঙ্গাল কো সরখার লে ক্ররো রুপিয়া দি রহিছো। তরহ বিকাশ চে ছইনা। ইও এওটা রহস্য যেসতো ছও’ (কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার কোটি কোটি টাকা দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে না। এটা একটা রহস্য)- বেশ উঁচু গলায় কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব অজিত ছেত্রী। ধোঁয়া ওঠা মোমোয় কামড় দিতে দিতে ভাবলাম, এ তো মেঘ না চাইতেই জল। কার্সিয়াং (Kurseong) বিধানসভার প্রাক নির্বাচনি রাজনৈতিক পরিস্থিতির আঁচ বুঝতে ডাওহিলের পাইন ঘেরা রাস্তার পাশের ছোট্ট মোমোর দোকানটি থেকে যে অনেক কথাই জানা যেতে পারে তা বুঝতে বাকি ছিল না।

রোহিণীর আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে কার্সিয়াংয়ের ভিউপয়েন্টে দাঁড়ালে নীচে সমতলের আলো দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু পাহাড়ের রাজনৈতিক মেঘ দেখে কখন বৃষ্টি হবে তা ঠাওর করা দায়। স্থানীয়দের আড্ডায় সুযোগ বুঝে নাক গলাতেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ হল। হাজারো সমস্যার কথা শোনালেন দোকানদার মহিলা। অজিতের সঙ্গী বিক্রমের কথা, ‘যে যখন ক্ষমতা পায় সে-ই তখন রাজা হয়। আমরা প্রজা হয়েই থাকি। কার্সিয়াংয়ের মতো এত পুরোনো শহরের আজও কোনও পরিকল্পনামাফিক উন্নয়ন হল না।’ ঘুরে ঘুরে খোঁজ নিতেই বোঝা গেল ক্ষোভের ফল্গুধারা বিধানসভার সর্বত্র বইছে।

২০২১-এর নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে কার্সিয়াং থেকে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির অনামী প্রার্থী বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতেই সেই কার্সিয়াংয়ের রাজনীতির চেনা ছবিটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে৷ আপাতদৃষ্টিতে এই কেন্দ্রে সব থেকে শক্তিশালী অনীত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা (বিজিপিএম) এবং শাসকদল তৃণমূলের কৌশলগত জোট। অন্যদিকে বিমল গুরুং ও জিএনএলএফ-এর সমর্থনে পাহাড় ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। সম্প্রতি বিষ্ণুপ্রসাদ বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। ফলে কার্সিয়াং এখন পদ্ম শিবিরের কাছে রাজনৈতিক আধিপত্যের এক অগ্নিপরীক্ষা।

অনীতের পার্টির সংগঠন শক্তিশালী ঠিকই, কিন্তু বিজেপির পেছনে যখন বিমল গুরুং আর জিএনএলএফ-এর মতো পুরোনো শক্তিগুলো এককাট্টা হয়, তখন লড়াইটা আর সহজ থাকে না। কার্সিয়াংয়ের রাজনৈতিক মানচিত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের নিজের জমি খুব একটা উর্বর নয়, সেটা পাহাড়ের ধুলোবালিও জানে। পাহাড়ে ঘাসফুলের ভরসা মূলত অনীত থাপার সাংগঠনিক শক্তি। বর্তমান সমীকরণ অনুযায়ী, কার্সিয়াং আসনে অনীত থাপার প্রার্থীকেই সমর্থন জোগাবে তৃণমূল। এই জোটের মূল লক্ষ্য হল পাহাড়ের উন্নয়নে সমতলের সরকারের সক্রিয় অংশগ্রহণকে হাতিয়ার করা। তবে সেই সক্রিয় করার কাজটা মোটেও মসৃণ নয়। যতই ফলাও করে উন্নয়নের কথা প্রচার করা হোক, গোর্খাল্যান্ড-এর প্রশ্নে পাহাড় এখনও একজোট।

কার্সিয়াং রেলস্টেশন লাগোয়া ক্যাফেতে বসে তা বেশ ভালোভাবেই টের পাওয়া গেল। প্রাক্তন শিক্ষক নরেন গুরুং রাখঢাক না রেখেই বললেন, ‘হামিলাই গোর্খাল্যান্ড ছাইনছো। গোর্খাল্যান্ড ভয়ে পছি বিকাশ আফিলে হুঞ্চ’ (আমরা গোর্খাল্যান্ড চাই। গোর্খাল্যান্ড হলে এমনিতেই উন্নয়ন হবে)। পাহাড়ের রাজনীতির সবচেয়ে বড় মোড়ক হল গোর্খাল্যান্ড। প্রকাশ্যে যে দল যা-ই বলুক না কেন, কার্সিয়াংয়ের প্রতিটি ভোটারের হৃৎস্পন্দনে আলাদা রাজ্যের দাবি আজও সমানভাবে স্পন্দিত। দুধিয়া-মিরিকের রাস্তার পাশেই সবজি বিক্রি করেন পেমা ভুটিয়া। ঝুড়ি থেকে ফুলকপি নামিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, ‘ভোট এলেই সবাই পাট্টা আর মজুরির কথা বলে। অনীত দাদা কিছু কাজ করছেন। কিন্তু গোর্খাল্যান্ডের প্রশ্নে বিজেপির ওপর আমাদের একটা বাড়তি ভরসা আছে।’ শেষ নির্বাচনেও গোর্খাল্যান্ডের হাওয়া তুলেই ভোট বৈতরণি পার করেছিল বিজেপি। ভোটের মুখে তেমন কোনও ইস্যু তুলে বাজার গরম করতে পারলে উন্নয়নের অনেক ছবি কিন্তু নিমেষেই কালো মেঘে ঢাকা পড়ে যেতে পারে।

অনীত ও বিজেপির সমীকরণের বাইরে অজয় এডওয়ার্ড বিকল্প ভাবনার জোগান দিতে শুরু করেছেন৷  তাঁর ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট দার্জিলিংয়ে যতটা হাওয়া তুলেছে, কার্সিয়াংয়ে তার প্রভাব অতটা নেই। তবে অজয়কে একেবারে বাতিলের খাতায় ফেলতে নারাজ অনেকেই। কার্সিয়াং বা মিরিকের শিক্ষিত তরুণদের একটা বড় অংশ অজয়কে পছন্দ করতে শুরু করেছে, তা চিন্তা বাড়াচ্ছে অনীতদের। তবে ভোট কৌশলীরা মনে করছেন, অজয় যত ভোট কাটবে, ততই বিজেপির সুবিধা হবে। তবে বিষ্ণুপ্রসাদের দলবদল নিয়ে খুব একটা আলোচনা কিন্তু কার্সিয়াংয়ে নেই৷ বিধায়ক হিসাবে তাঁর পারফরমেন্সে খুশি নয় আমজনতা। বহু এলাকায় সাধারণ মানুষ বিধায়ককে চেনেনই না। ফলে দলবদলু বিষ্ণুপ্রসাদের নির্বাচনি ময়দানে দাগ কাটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

কুয়াশা যখন ডাওহিলের পাইন বনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, তখন উন্নয়নের হিসেবনিকেশ আর রাজনৈতিক দলবদল – সবই যেন এক ধূসর গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। অনীত থাপার ‘বিকাশ’ আর বিজেপির ‘আশ্বাস’-এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের সেই কয়েক দশকের পুরোনো গোর্খা আবেগ আজও এক তৃষ্ণার্ত মেঘের মতো কার্সিয়াংয়ের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে। ২০২৬-এর নির্বাচনি বসন্ত কার্সিয়াংয়ের রুক্ষ রাজনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে, নাকি সেই পুরোনো আশার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে পাহাড়ের নীরব ভোটারদের মনে।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

More like this
Related

Election Ground Report | পাহাড় থেকে সমতল: ক্ষোভের চোরাস্রোতে কি ভাঙবে ঘাসফুলের দুর্গ? উত্তরে শাসকের শক্তিক্ষয়ের আভাস

শীতলকুচির বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা গ্রাম থেকে বৈষ্ণবনগরের গঙ্গার পার,...

Siliguri-Darjeeling | ভোটের জেরে শিলিগুড়ি-দার্জিলিং রুটে কড়াকড়ি, ঘুরপথে যাতায়াতে দুর্ভোগের আশঙ্কা

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: বিধানসভা ভোটের জেরে মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার...

WB Election 2026 | প্রচারে গিয়ে হামলার মুখে আরাবুল, ভাঙল গাড়ির কাঁচ! ঘটনায় উত্তপ্ত বাসন্তী হাইওয়ে

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা এলাকায় প্রচারে...

Moers | জার্মানির গুরুদ্বারে তুলকালাম: চলল ছুরি-পেপার স্প্রে!

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: ধর্মীয় উপাসনালয়ের ভেতরেই চলল ছুরি,...