সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি: সকাল হলেই বাড়ির দাওয়ায় বসে বাঁশ কেটে বাতা তৈরি করেন বীরেন মার্ডি, লক্ষ্মী হেমব্রমরা। এই বাঁশের বাতা দিয়ে তাঁরা ছোট ঝুড়ি, বড় ঝুড়ি, কুলো, বিভিন্ন সাইজের রঙিন চালনও তৈরি করেন। তাঁদের মতো শতাধিক আদিবাসী পরিবারের এটাই পেশা। ছবিটি কুশমণ্ডি (Kushmandi) ব্লকের মঙ্গলপুরের উত্তরপাড়ার। কিন্তু এই বাঁশের ঝুড়ি বিক্রি করে যা লাভ হয় তা দিয়ে তাঁদের কোনওমতে দিন চলে যায়।
সারাবছর ধরে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করেন তাঁরা। দুই দিনাজপুর সহ মালদা জেলায় একাধিক ছোট-বড় হাট বসলেও কোনও হাটে এইসব বাঁশের তৈরি জিনিস সেভাবে বিক্রি হয় না। তাঁদের তৈরি এই জিনিসগুলি বিহারের বাজারে চলে যায়। বিহার থেকে ফড়েরা আসেন উত্তরপাড়ায়। বড় বড় ট্রাকবোঝাই করে তাঁরা বাঁশের তৈরি সামগ্রীগুলি নিয়ে যান। তবে তাঁরা যে দামে জিনিসগুলি কেনেন তার থেকে অনেক বেশি দামে সেগুলি বিহারের বাজারে বিক্রি হয়। কিশনগঞ্জ, পূর্ণিয়া থেকে সুলতানগঞ্জ হয়ে বেগুসরাই পর্যন্ত বিক্রি হয় উত্তরপাড়ায় তৈরি এই বাঁশের সামগ্রী।
প্রতিটি ব্লকে হস্তশিল্প দপ্তরের অফিস রয়েছে। কিন্তু এই উত্তরপাড়ার আদিবাসীরা কেউ কোনওদিন লোন বা অন্য সরকারি সুবিধার জন্য আবেদন করেননি। তবে এই উত্তরপাড়ার আদিবাসী শিল্পীরা যাতে সরকারি সুযোগসুবিধা পান সেজন্য কুশমণ্ডি ব্লকের শিল্প আধিকারিক অমিত মজুমদার তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আশ্বাস দিয়েছেন। এই শিল্পীরা তাঁদের তৈরি ঝুড়ি, চালন, কুলো নিয়ে যদি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন মেলায় যেতে চান তাহলে তিনি সেই ব্যবস্থাও করবেন বলে জানিয়েছেন।
গ্রামবাসী ইমানুয়েল টুডু জানান, বাঁশ কেটে বাতা বের করে ঝুড়ি বানানোই উত্তরপাড়ার আদিবাসীদের ললাটে রয়েছে। তিনি কোনওদিন শিল্প দপ্তরের নাম শোনেননি। পরবর্তীতে সরকারি সুবিধার জন্য আবেদন করবেন কি না, প্রশ্নে ইমানুয়েল বলেন, ‘সরকারের থেকে লোন বা কোনও সুযোগসুবিধা পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। তার চেয়ে বিহারের ফড়েদের ওপর নির্ভর করে জীবন কেটে গেলে কোনও ক্ষতি নেই।’
উত্তরপাড়ার বাসিন্দা আব্রাহাম হেমব্রম বলেন, ‘প্রতি বছরই বাঁশের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু যখন বাঁশের জিনিস তৈরি করে সেগুলি ফড়েদের কাছে বিক্রি করি তখন তাঁরা সেভাবে দাম বাড়াতে চান না।’ তবুও বিহারে এই জিনিসের চাহিদা রয়েছে, এর জন্য তাঁরা এগুলি তৈরি করেন ও লাভ কম রেখে ফড়েদের কাছে সেগুলি বিক্রি করে দেন।
রসিনা টুডু আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমাদের থেকে কম দামে জিনিস কিনে বিহারের বাজারে তা বেশি দামে বিক্রি করলেও কিছু করার নেই। আমাদের সেই সামর্থ্য নেই যে, আমরা জিনিসপত্র ট্রাকে বোঝাই করে বিহারে গিয়ে বিক্রি করব।’

