- আশিস ঘোষ
এসআইআর নিয়ে গোটা দেশে হুলুস্থুল। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পিছনে আসলে কাদের নাম বাদ দেওয়ার মতলব, তা নিয়ে বিরোধীদের তোপ নির্বাচন কমিশনের দিকে। বাজার যাকে বলে গরম। সদ্য এই চটজলদি সংশোধন শেষ হয়েছে বিহারে। আর দিনদুয়েক পরে ভোট সেখানে। তবে এসআইআরের পর বিহারে স্বস্তি যত না, প্রশ্ন উঠেছে তার অনেক বেশি।
বিহারে এসআইআরে দেখা যাচ্ছে, সবথেকে বেশি বাদ গিয়েছে মহিলা ও মুসলিমদের নাম। সবসময়ই বিহারে মহিলাদের জনসংখ্যার তুলনায় ভোটার লিস্টে মহিলাদের নাম থাকে সামান্য কম। তবে পরপর কয়েকটা ভোটে দেখা গিয়েছে, মহিলা জনসংখ্যা এবং মহিলা ভোটারের ফারাক ক্রমে কমছিল। ২০১২ সালে ফারাক ছিল ২১ লাখ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সেই ফারাক কমে হয়েছিল ৭ লাখ।
কিন্তু এবারের এসআইআরে এই ধারাটা পুরো উলটো হয়ে গিয়েছে। এখন সবমিলিয়ে হারিয়ে যাওয়া মহিলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ! হিসেবমতো প্রতি এক হাজার পুরুষ ভোটার অনুপাতে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৮৯২। এতটা কম ২০২০ সালের পর আর হয়নি। এবছর ভোটার তালিকায় নতুন করে যত নাম যোগ হয়েছে, তাতে মহিলাদের হার মাত্র ১৭.৯৩ শতাংশ। ২০২০ সালে নতুন মহিলা ভোটারের হার ছিল ৫৩.৫১ শতাংশ।
এবারের ফাইনাল তালিকায় পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৩ কোটি ৯২ লাখ, মহিলা ৩ কোটি ৪৯ লাখ। শুধু মহিলা কেন, প্রশ্ন মোট ভোটারের সংখ্যা নিয়েও। গত চোদ্দো বছর আদমশুমারি হয়নি এদেশে। তবু জনসংখ্যার বৃদ্ধির যে হার কেন্দ্রীয় সরকার ঠিক করেছে, তাতে বিহারের ভোটার সংখ্যা হওয়া উচিত ছিল ৮ কোটি ২২ লাখ। অথচ এসআইআরের পর সেরাজ্যে ভোটারের সংখ্যা হয়েছে ৭ কোটি ৪৩ লাখ। বাকিরা গেল কোথায়? প্রশ্ন ভোট বিশেষজ্ঞ যোগেন্দ্র যাদবের।
ঠিক কত মুসলিম বাদ গিয়েছেন, তা চট করে বলা কঠিন। কারণ ভোটার তালিকায় কারও ধর্ম পরিচয় লেখা থাকে না। তবে ভোটারদের নাম ধরে বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বাদ যাওয়ায় ক্ষতি বেশি হয়েছে মুসলমানদের। খসড়া তালিকা থেকে ৬৫ লাখ নাম বাদ পড়েছে। তার চার ভাগের এক ভাগ মুসলিম। চূড়ান্ত তালিকায় বাদ যাওয়া ৩ লাখ ৬৬ হাজারের তিনভাগ তারাই। বিহারে জনসংখ্যার ১৬.৯ শতাংশ মুসলিম। দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৬ লাখ মুসলিমের নাম হয়তো অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিহারে মুসলিমরা লালুপ্রসাদের আরজেডি’র সমর্থক বলে পরিচিত।
কমিশন জানিয়েছে, বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ২৪ হাজারের নাম ঠিকমতো পড়া যায়নি। হাজার ছয়েকের লিঙ্গ পরিচিতি অস্পষ্ট। ৫.২ লাখ নাম দু’বার তোলা হয়েছিল। ৫১ হাজারের নাম বাদ পড়েছে বাবা, মা কিংবা স্বামীর নামে ভুল থাকায়। বাড়ির নম্বর না থাকা কিংবা ভুল ঠিকানা থাকায় বাদ পড়েছে ২ লাখের বেশি নাম। এই জায়গাতেই প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষকদের।
বিহারে ২৪ লাখের বেশি বাড়িতে বসবাসকারীর সংখ্যা ভোটার তালিকা অনুযায়ী দশের বেশি। এই বাড়িগুলির বাসিন্দাদের যোগ করলে দাঁড়ায় ৩ কোটি ২০ লাখ। উৎসাহীদের জন্য আরও কিছু পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। এবার সবথেকে বেশি মহিলা ভোটার বাদ পড়েছে গোপালগঞ্জ জেলায়। প্রায় ১৫ শতাংশ। এরপর মধুবনী। বাদ পড়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার। পূর্ব চম্পারণে বাদ গিয়েছে ৬.৭ শতাংশ মহিলা।
সীমান্তবর্তী যে ৬টি জেলায় সবথেকে বেশি মহিলা ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, সেগুলিতে রয়েছে ৫৯টি বিধানসভা কেন্দ্র। এর মধ্যে মহাগঠবন্ধন গতবার পেয়েছিল ২৫টি, এনডিএ ৩৫টি। সকলেই মানবেন, বিহারে নীতীশ কুমারের সমর্থনের বড় ভিত্তি মহিলারা। গত দশ বছরে নীতীশের সরকার মহিলাদের জন্য নানাবিধ প্রকল্প চালাচ্ছে। পঞ্চায়েতে মহিলাদের ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ। তার উপর মদ নিষিদ্ধ।
জাতপাতের ঊর্ধ্বে এইসব কাজ নীতীশের সমর্থনের ভিত্তি পোক্ত করেছে। নীতীশের আমলে ১১ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী হয়েছে। ১ কোটি ৪ লাখ জীবিকা কর্মী, ১ কোটি ২১ লাখ মহিলা শিল্পোদ্যোগীকে ১০ হাজার টাকার উৎসাহ অনুদান সেই ভিত আরও মজবুত করেছে বলে দাবি নীতীশের জেডিএস (ইউ)-এর।
মহিলাদের মধ্যে প্রভাব বাড়াতে চেষ্টায় কসুর নেই তেজস্বী যাদবেরও। তিনি জীবিকা কর্মীদের ২ বছরের জন্য বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সঙ্গে রয়েছে মা-বেটি প্রকল্প। মাসে দুঃস্থ মহিলাদের আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। অর্থাৎ মহিলাদের ভোট পেতে বিহারে জোর দিচ্ছে সব পক্ষই। নীতীশের এনডিএ’র দাবি, জিতলে তারা এক কোটি লাখপতি দিদি তৈরি করবে।
শেষপর্যন্ত মহিলাদের ভোটে কোন পক্ষের লোকসান আর কোন পক্ষের লাভ হবে তা নিয়ে গবেষণা চলছে এখন। ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া মহিলারা কার কপাল পোড়াবেন, জল্পনা চলছে তা নিয়েও। তবে বাদ পড়া না পড়া নিয়ে যতই বিতর্ক হোক না কেন, একটা সত্য এড়াতে পারবে না কেউই। এবার বিহারে ২৪৩টি বিধানসভা আসনে যত প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন তাঁদের সংখ্যা ২,৬১৬। তাঁদের মধ্যে মহিলা প্রার্থী মাত্রই ২৫৮। মোট প্রার্থীর ১০ শতাংশ।
মহিলাদের মনোরঞ্জনে কোটি কোটি টাকা ঢালা হলেও তাঁদের ক্ষমতায়নের বেলায় সব পক্ষই সমান। বিজেপির মহিলা প্রার্থী ১৩, জেডিইউয়ের ১৩ আর আরজেডির ২৩।

