অরবিন্দ ঘোষ
পরিবেশ আন্দোলন আসলে প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষার্থে এক নিরন্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক লড়াই। পরিবেশ বনাম উন্নয়ন এবং অধিবাসী বনাম রাষ্ট্র- এই দ্বন্দ্ব সভ্যতার ইতিহাসে দীর্ঘদিনের। প্রকৃতি নামক রক্ষাকবচটি যেমন মানুষকে বাঁচতে শিখিয়েছে, তেমনি মানুষের অপরিমেয় চাহিদাও মিটিয়েছে নিঃস্বার্থে। আর এই দ্বিতীয় কারণেই হয়তো আজ মানুষের নিজের স্বার্থেই প্রকৃতিকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই তাগিদ থেকেই বিভিন্ন দশকে দানা বেঁধেছে পরিবেশ আন্দোলন। বর্তমান সময়ে পরিবেশের যে দ্রুত অবক্ষয় হচ্ছে, তাতে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই এই আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে ভাবাচ্ছে।
ইতিহাস ফিরে দেখলে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে ১৭৩০ সালে (মতান্তরে ১৭৩৭) রাজস্থানে গাছ বাঁচাতে বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের লড়াই এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিল। যোধপুরের মহারাজার নবপ্রাসাদ নির্মাণের জন্য খেজরি গাছ কাটার নির্দেশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন অমৃতা দেবী। গাছকে আলিঙ্গন করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন ৩৬৩ জন বিষ্ণোই প্রতিনিধি। সেই আত্মত্যাগ বিফলে যায়নি। স্বাধীন ভারতে পরিবেশ আন্দোলনের নতুন জোয়ার আসে ১৯৬৪ সালে দাশোলি গ্রাম স্বরাজ্য সংঘ গঠনের মাধ্যমে, যার নেপথ্যে ছিলেন চণ্ডীপ্রসাদ ভাট। পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকে কেরলের ‘সাইলেন্ট ভ্যালি’ আন্দোলন, ১৯৭৩-এ উত্তরাখণ্ডের ‘চিপকো’ আন্দোলন এবং ১৯৮০-র দশকে ‘তেহরি বাঁধ’ সংঘাত ও ‘নর্মদা বাঁচাও’ আন্দোলন পরিবেশ রক্ষার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। দক্ষিণ ভারতেও চিপকোর আদলে ১৯৮৩ সালে শুরু হয় ‘অ্যাপিকো’ আন্দোলন। এছাড়া আশির দশকেই ‘জঙ্গল বাঁচাও’ এবং ‘পশ্চিমঘাট মার্চ’-এর মতো কর্মসূচিগুলি প্রকৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। এই আন্দোলনগুলির মূল লক্ষ্য শুধু বন বা বন্যপ্রাণী রক্ষা ছিল না, বরং আদিবাসী সম্প্রদায়ের সম্পদ ও সংস্কৃতিকে আগলে রাখাও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য।
একথা স্বীকার করতেই হয়, বিষ্ণোই থেকে নর্মদা কিংবা অমৃতা দেবী থেকে সুন্দরলাল বহুগুণা বা মেধা পাটকর- সব লড়াকু ব্যক্তিত্বই সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালিয়েছেন। তাঁদের আন্দোলনের ভাষা ছিল সহজ- প্রকৃতিকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ। তাঁরা হয়তো আইনের জটিল মারপ্যাঁচ বা আদালতের পুঁথিগত সংজ্ঞা জানতেন না, কিন্তু প্রকৃতিকে জড়িয়ে ধরে তাঁরা সবুজকে বাঁচাতে জানতেন। তাঁদের হাত ধরেই বেঁচেছে কেরলের বৃষ্টিঅরণ্য, কর্ণাটকের ট্রপিক্যাল ফরেস্ট কিংবা মধ্য ভারতের শালবন।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী পরিবেশ ও বন সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়েরই। সরকার আইন প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত নেয় ঠিকই, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যখন নেতিবাচক হয়, তখনই জন্ম নেয় জনবিক্ষোভ। সাম্প্রতিককালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আরাবল্লি পাহাড়ের সংজ্ঞা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে রাজস্থান ও হরিয়ানার গ্রামবাসীদের বিক্ষোভ তারই প্রমাণ।
একবিংশ শতাব্দীতে জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়ংকর সংকটের মুখে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে পরিবেশ আন্দোলনের গুরুত্ব পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি। প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের জন্য শুধু দরিদ্র মানুষের জীবিকা দায়ী নয়, বরং প্রভাবশালীদের অসততা ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষাই প্রধান কারণ। তাই বর্তমানের জীববৈচিত্র্য সংকট মেটাতে পরিবেশ রক্ষা কেবল আবেগের বিষয় নয়, বরং বাঁচার অধিকারের লড়াই। এই লড়াইয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটের সেই জনপ্রিয় স্লোগান- ‘Do not change the climate, change the system’।
(লেখক শিক্ষক। মালদার বাসিন্দা)

