শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

বিকল্প হয়ে ওঠার স্বতন্ত্র ভাষ্যই নেই বামেদের

শেষ আপডেট:

গৌতম সরকার

জ্যৈষ্ঠের প্রকৃতিতেও দ্বিমেরু (বাইনারি) তত্ত্ব। ঘাম ঝরলেও বর্ষণসিক্ত উত্তরবঙ্গে তাপ কিছুটা কম। অথচ দক্ষিণে ভয়ংকর আর্দ্রতায় অতিষ্ঠ জনজীবন। এই দ্বিমেরু নির্বাচনি ফলাফলেও। উত্তর আসক্ত পদ্মের সুবাসে। মানচিত্র দেখলে বোঝা যাবে ঘাসফুলের সবুজে সবুজ গঙ্গার পাড়। লালের ছিটেফোঁটা নেই বাংলার উত্তর ভূভাগে। টিমটিমে প্রদীপের মতো মালদা দক্ষিণে শুধু হাত প্রতীক। দক্ষিণ লালহীন, নীলও নেই। বিজেপি আর তৃণমূলে ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছে অতীতের লালদুর্গ।

ভয়ংকর দ্বিমেরু। গণনার পরদিন বাম ঘরানায় বড় হয়ে ওঠা জলপাইগুড়ির এক পরিচিত শিক্ষক জানিয়েছিলেন, তাঁর ভোটটা গিয়েছে ‘জয় শ্রীরামে’। শিলিগুড়ির বিধান মার্কেটে এক ফলের দোকানদার সিপিএম সমর্থক। হেসে বললেন, ‘ভোটটা নষ্ট করিনি। আমাদের দল দার্জিলিং কেন্দ্রে কংগ্রেসকে সমর্থন করেছে। কংগ্রেস জিতবে না জানতাম। তাই আর কী…।’ ‘ভোট নষ্ট’ লবজটা ছোটবেলায় কখনও শুনিনি। কলেজে পড়তে পড়তেও শুনিনি।

ভোট নষ্টের ধারণাটা আমদানি হয়েছিল আটের দশকে। চালু করেছিল বামেরাই। তখন বিরোধী বলতে কংগ্রেস। ছন্নছাড়া কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে কী হবে, প্রশ্নটা চাগিয়ে তোলা হয়েছিল নিপুণ মুনশিয়ানায়। এখন সেই ধারণার খেসারত দিতে হচ্ছে আলিমুদ্দিন অনুগামীদের। অথচ পাঁচ, ছয়ের দশকে কমিউনিস্ট পার্টি হেরে ভূত হবে জেনেও ভোট দিতেন অনেকে। নিষ্ঠায়, আনুগত্যে, মতাদর্শে অবিচল থেকে। সেই ভিতটা নড়ে গিয়েছিল ৩৪ বছরের শাসকদলের সৌজন্যেই।

শিলিগুড়ির বিধান মার্কেটে সেই ফলের দোকানদারের অসমাপ্ত কথাটা শেষ করেছিলেন পাশে দাঁড়ানো অন্য একজন। ‘এত দুর্নীতি চারদিকে, বিধান মার্কেটের উন্নয়নে নজর নেই। উলটে ব্যবসায়ীদের দোষারোপ, হয়রানি। কী করে তৃণমূলকে ভোট দেবে বলুন!’ বুঝতে অসুবিধা হয় না, তৃণমূলের প্রতি রাগে-ক্ষোভে বাম সমর্থকদের একাংশ ইভিএমে পদ্মের প্রতীকই টিপে দিয়েছে। ফোন এসেছিল বালুরঘাটের আরএসপি পরিবারের এক বধূর। ভয়ংকর উত্তেজিত, ‘বাম ন্যারেটিভটাই তো শেষ করে দিয়েছেন বামফ্রন্ট নেতারা।’

ন্যারেটিভ স্বাতন্ত্র্য তৈরি করে। পৃথক পরিচিতি গড়ে দেয়। আমার স্কুল, কলেজ জীবনে দেখেছিলাম, কে বাম ছাত্র নেতা, কে অবাম সংগঠনের নেতা চিনিয়ে দিতে হত না। মুখের ভাষা, আচরণ, পড়াশোনার মান ইত্যাদিতে সহজে পার্থক্যটা বুঝে নেওয়া যেত। আটের দশক থেকে সেই পার্থক্যের জায়গাটা গুলিয়ে যেতে শুরু করে। ফারাকের মাপকাঠিটা হারিয়ে যায় ক্রমশ।

তবে হ্যাঁ, সেই পুরোনো মাপকাঠিটা মনে পড়ে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধর, প্রতীক-উর রহমানদের দেখলে। শুধু ওঁরা কেন, ফালাকাটার মতো গ্রামীণ এলাকাতেও জনাকয়েক ঝকঝকে তরুণ-তরুণীকে দেখবেন, যাঁরা নতুন করে সিপিএমের ঝান্ডা কাঁধে নিয়েছেন। দল সরকারে নেই। আশু আসার সম্ভাবনাও নেই। ফলে বাম আমলের মতো চাকরি বা অন্য সুবিধা পাবেন না জেনেও ঝান্ডা বইছেন।

কলকাতায় আমার এক পুরোনো সহকর্মী আক্ষেপ করছিলেন, ‘ভেবেছিলাম, দু-একটা আসন অন্তত বামেরা পাবে। যাদবপুরে সৃজনকে ঘিরে এত ভিড়, এত উৎসাহ। কিন্তু নেমে গেল তিন নম্বরে।’ কোচবিহারের বাসিন্দা একসময় নকশাল আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী দেখলাম ফেসবুকে বিজেপির পরাজয়কে সুখবর লিখেছেন। পাশাপাশি তাঁর বক্তব্য, ‘মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম, বামেদের তরুণ ব্রিগেড থেকে অন্তত কেউ কেউ যাবেন।’ তা না হওয়ায় ভীষণ বিষণ্ণ তিনি।

আসলে ভিড়ের প্রতিফলন সবসময় ইভিএমে পড়ে না। লোকে হয়তো কথা মন দিয়ে শোনে। বাহবা দেয়। কিন্তু বিকল্প হিসেবে বামেদের ওপর আস্থা রাখে না। ধারণাটা তৈরি হয়ে গিয়েছে, এরা জিতবে না, এদের ভোট দিয়ে কী লাভ! কেন এই ধারণা? ব্যাখ্যাটা দিলেন বালুরঘাটের সেই কন্যা (এখন মাঝবয়সি)। বলছিলেন, ‘সমস্যাটা তো বিকল্প ন্যারেটিভের। যা থাকলে মানুষ বিকল্প হিসেবে বামেদের ভাবতে পারত।’

তাঁর উদাহরণ, ‘এই যে কে বড় হিন্দু প্রমাণে তৃণমূল ও বিজেপির প্রতিযোগিতা, সেখানে আমাদের বামেদের অবস্থান কী বলুন তো! আমরা রাজনীতিতে ধর্ম মেশানোর বিরোধিতা করি।

অথচ নিজেরা ধর্মনিরপেক্ষ আচরণ করি না। দক্ষিণপন্থী দলের লোকেদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমাদের ফারাক বোঝা যায় না। তৃণমূল ও বিজেপির বিকল্প আমাদের কোনও ন্যারেটিভ নেই।’

সেটাই যেন আরও বিশদে বললেন কোচবিহারের রাজনৈতিক জীবন থেকে দূরে থাকা, অথচ মনেপ্রাণে বামপন্থী এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। ‘তৃণমূল, বিজেপির মতোই বামেরা ভোটকেন্দ্রিক ন্যারেটিভে ডুবে গিয়েছে।’ আক্ষেপ করলেন প্রৌঢ়, ‘আমাদের দলের রাজ্য সম্পাদক নিজে নেমে পড়লেন সাংসদ হতে। অজুহাত দিলেন, ক্যাপ্টেনকে নন-প্লেয়িং থাকলে হয় না।’ ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘আরে বাপু, দলের রাজ্য সম্পাদক কী করে নন-প্লেয়িং হন? তিনি তো দলের পরিচালক, দলের নির্বাচনি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক। তাঁর চেয়ে প্লেয়িং ক্যাপ্টেন আর কে আছে আমাদের দলে! সেই ধারণাটাই গুলিয়ে দিলেন সেলিম।’

বামপন্থী লোকেদের কথায় স্পষ্ট, তৃণমূল-বিজেপির ‘বাইনারি’তে ‘সেটিং’য়ের তত্ত্বটা নেহাতই আজগুবি। পাবলিক খায়নি। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের ঐক্যের সেই গা গরম করা শ্রেণিসচেতনতার স্লোগানের ধারে মরচে পড়ে গিয়েছে অতীতে দলের কর্মসূচিতে উল্লিখিত ‘পুঁজিপতি, সামন্তপ্রভু, জোতদারদের পার্টি’ কংগ্রেসের সঙ্গে মাখামাখিতে। বিকল্প ন্যারেটিভ যদি না থাকে, মানুষ আপনাদের বিকল্পের স্থান দেবে কেন কমরেড? ফলে তৃণমূল দুর্নীতি করেছে প্রচারে বিশ্বাস রেখে বামেদের কেউ কেউ বিজেপিতে ভোট দিয়েছেন।

আবার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং রাজ্য সরকারের অন্য সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পে উপকৃত হয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দলের আনা দুর্নীতির অভিযোগ ভুলে গিয়েছেন অনেক বাম সমর্থক। তৃণমূলকে না দিলে বিজেপি, পদ্মের বোতামে চাপ না দিলে ঘাসফুলে ছাপ- এই ধারণাটা তৈরি হয়ে আছে। আটের দশকে নিজেদের তৈরি ‘ভোট নষ্টে’র প্রচারটা এখন বামেদের বুমেরাং হয়ে গিয়েছে। নাহলে ২৩ জন সিপিএম প্রার্থীর ২১ জনেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হবে কেন? সেই তালিকায় তরুণ ব্রিগেডও আছে।

ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের একটি বুথে সিপিএম প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট মাত্র ১। দুটি বুথে ২ করে। অতীতের শাসকের এই লজ্জাজনক ফল প্রত্যাশিতই। বঙ্গে যেমন তৃণমূল না হয় বিজেপি, দেশে তেমনই হয় এনডিএ, না হয় ‘ইন্ডিয়া’। রাজস্থান, তামিলনাডুতে সিপিএম যে ছিটেফোঁটা দু-একটি পেয়েছে, সেটা জোটের সুবাদে। কংগ্রেস ও ডিএমকে’র দাক্ষিণ্যে, একার মুরোদে নয়। দেশ ও রাজ্যের প্রেক্ষাপটে নিজস্ব ভাষ্য, স্বাতন্ত্র্যের জায়গাটা তৈরি করার ব্যর্থতায় ভিড় ও হাততালি পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ভোট জুটবে না। ক্ষমতা তো পরের কথা।

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

নারী লাঞ্ছনায় পরিবার একাকার

রূপায়ণ ভট্টাচার্য শিলিগুড়ির অর্চনা ঝা বা লক্ষ্মী শর্মারা আজকের ভারতে...

এসআইআর কি বুমেরাং, প্রশ্ন উঠছে বিজেপিতেই

  আশিস ঘোষ  ভোট আসছে। তাই সব দলই যে যার...

ভুল বৃত্তে কিশোরীরা, স্কুল-সমাজের দায়িত্ব অনেক

অনিন্দিতা গুপ্ত রায় ‘ম্যাম, আগের পরীক্ষাগুলো দিইনি। অ্যানুয়ালটা দিতে পারব...

তামাশা ও ধাঁধার জালে সত্যের থই মেলা ভার

গৌতম সরকার ছিলেন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী। হলেন রাজ্য সংখ্যালঘু...