সুমন ভট্টাচার্য
কেমি ব্যাডেনোচ ব্রিটেনে রক্ষণশীলদের নতুন নেত্রী। কৃষ্ণাঙ্গ এই মহিলার জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন নাইজিরিয়ায়। তারপরে ইংল্যান্ডে এসে পড়াশোনা এবং ‘টোরি’ দলের নেত্রী হয়ে ওঠা। যিনি নিজে আফ্রিকার নাগরিক বাবা-মায়ের সন্তান, তিনি ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টির কড়া অভিবাসন নীতির সবচেয়ে বড় সমর্থক। অর্থাৎ ঋষি সুনক ব্রিটেনে আগত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের রোয়ান্ডায় পাঠিয়ে দেওয়ার যে নীতি নিয়ে এসেছিলেন, তার সবচেয়ে সোচ্চার সমর্থক ‘টোরি’দের নতুন নেত্রী কেমি ব্যাডেনোচ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কথা বলছেন ‘হিন্দু স্বার্থরক্ষা’র জন্য। ইহুদি আইনজীবীকে বিয়ে করা কমলা হ্যারিসকে দেগে দিচ্ছেন ‘মুসলিম মৌলবাদ’-কে সমর্থনের দায়ে। বুধবার সকালে, মানে মার্কিনি সময় অনুযায়ী মাঝরাতে, ট্রাম্পের সমর্থনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিনিদের উল্লাস দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল রাজনীতিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলতে পারাটাই বোধহয় নিয়ম।
খাস বিলেত এবং মার্কিন মুলুকের উদাহরণ টেনে এই লেখা শুরু করার কারণ, আমাদের দেশে ‘কমিউনিজম চর্চা’ বা বামপন্থী দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডের কমিউনিস্ট পার্টিকে দেখেই। তাহলে যদি সিপিআই(এমএল)-এর নেতা, একসময়ের তুখোড় ছাত্র, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের নাম বদলের প্রস্তাব দিয়ে থাকেন, তাতে এত ‘গেল গেল’ রব ওঠার কিছু নেই। এক সপ্তাহের মধ্যে হতে চলা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ৬টি কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এবার বামফ্রন্ট সিপিআই(এমএল)-কে একটি আসন ছেড়েছে। দক্ষিণবঙ্গের নৈহাটি, যা এত দিন আলিমুদ্দিন স্ট্রিট নিজেদের ‘দুর্গ’ বলে মনে করত, সেখানে এবার লড়ছে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের দল। এবং নৈহাটিতে বৃহত্তর বাম ঐক্য গড়ে তুলতে বুধবারই সেখানে জনসভা করেছেন সিপিআই(এমএল)-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহঃ সেলিম। এইরকম আবহেই দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বামফ্রন্টের নাম বদলের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, যেহেতু তাঁরা এতদিন বামফ্রন্টের সদস্য ছিলেন না, কিন্তু বৃহত্তর ‘বাম ঐক্য’র জন্য এবার তাঁরা বামফ্রন্টের সঙ্গেই আসন সমঝোতায় গিয়েছেন, সেহেতু এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে একদা পশ্চিমবঙ্গের শাসক জোটের নাম পরিবর্তন করা উচিত। দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এই প্রস্তাব দেওয়া মাত্র যেভাবে আলোড়ন উঠেছে এবং বামফ্রন্টের পুরোনো শরিকরা ‘গেল গেল’ করে রব তুলেছে, তাতে মজা পাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই।
প্রথমত বাস্তবতার নিরিখে আগে বুঝতে হবে এই মুহূর্তে গোটা ভারতবর্ষের নিরিখে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের দল সিপিআই(এমএল)-এর ফরওয়ার্ড ব্লক বা আরএসপির মতো দলগুলির চাইতে বেশি শক্তি রয়েছে। লোকসভায় তাঁদের দুজন সাংসদ রয়েছেন, বিহার বিধানসভায় তাঁদের ১১ জন বিধায়ক রয়েছেন। ঝাড়খণ্ডেও দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের দলের একজন বিধায়ক ছিলেন, যদিও এবারে ‘ইন্ডিয়া’ জোট তাঁকে আসন না ছাড়ায় সেই আসনটি আবার সিপিআই(এমএল) জিততে পারবে কি না তা পরিষ্কার নয়। যদি শুধু সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বিচার করতে হয়, তাহলে একমাত্র সিপিআই(এম) এবং সিপিআইয়ের সংসদীয় রাজনীতিতে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের দলের চাইতে বেশি শক্তি রয়েছে। অর্থাৎ লোকসভার সদস্যের নিরিখে কিংবা রাজ্যসভার সাংসদদের মাথা গুনলে সিপিআই(এমএল) দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বামশক্তি। তাহলে গোটা পৃথিবীতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বাড়বাড়ন্তের যুগে, এবং সেই ধারাকে অব্যাহত রেখে পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরার মতো রাজ্যে যেখানে বামেদের ভোটব্যাংক বিজেপি গ্রাস করে নিয়েছে, সেখানে যদি বামেদের নতুন করে ভাবতে হয় এবং ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টায় নামতে হয়, তাহলে ‘রি-প্যাকেজিং’-এ এত আপত্তি থাকার কী আছে?
এখনও দেশের প্রধান বামপন্থী দল হিসেবে স্বীকৃত সিপিআই(এম) বা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেল এই বঙ্গের সিপিআই(এম) নিশ্চয়ই নতুন করে ভাবছে। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট নতুন পথে হাঁটার অন্তত চেষ্টা শুরু করেছে বলেই, তারা এতদিনের ‘চিরশত্রু’, যাদেরকে ‘কংশাল’ বলে বিদ্রূপ করা হত, নকশালপন্থীদের মধ্যে সেই সবচেয়ে বড় দল সিপিআই(এমএল)-এর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলি যদি সময়ের নিরিখে দাঁড়িয়ে নিজেদের বাস্তবতাকে বদলে ফেলতে পারে, তাদের নেতা বা নেত্রীরা যদি ব্যক্তিজীবনকে অতিক্রম করে রাজনৈতিক স্লোগান ঠিক করেন, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের বামেরাই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? বুদ্ধিমান দীপঙ্কর ভট্টাচার্য তাই মনে করিয়ে দিয়েছেন, কংগ্রেস বা সোনিয়া গান্ধি ‘ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স’ বা ইউপিএ নাম নিয়ে দু’বার অর্থাৎ টানা দশ বছর কেন্দ্রে সরকার চালালেও এই ২০২৪-এর লোকসভার নির্বাচনের আগে যখন আবার বিজেপি-বিরোধী জোট তৈরি হল, তখন তার নাম হল ‘ইন্ডিয়া’। এবং সেই জোটের অন্যতম শরিক, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি অনুযায়ী জোটের এই নতুন নামকরণ তিনিই করেছেন।
সিপিআই(এমএল) ‘বৃহত্তর বাম ঐক্য’র কথা বলে ‘বামফ্রন্ট’-এর নাম বদলের যে বলটি গড়িয়ে দিয়েছে, এটা স্বাভাবিক যে, তা নিয়ে রাজনীতির অঙ্গনে অনেক চর্চা হবে, বিতর্কও থাকবে। এবং এই বঙ্গের রাজনীতির নিরিখে একেবারে ‘প্রান্তিক শক্তি’-তে পরিণত হয়ে যাওয়া ফ্রন্ট শরিকদের, যেমন আরএসপি বা ফরওয়ার্ড ব্লকের এই নিয়ে তীব্র আপত্তিও থাকতে পারে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত টিকে থাকা ‘বামফ্রন্ট’-এর সবচেয়ে বড় দল হিসেবে সিপিআই(এম)-এর অনেক দিন ধরেই বাম শরিকদের বিভিন্ন ‘আবদার’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। সিপিআই(এম)-এর অনেক নেতাই আড়ালে-আবডালে বলে থাকেন যে, এই বাম শরিকদের আপত্তিতেই বা বিভিন্ন অজুহাতে ‘বামফ্রন্ট ছেড়ে বেরিয়া যাওয়ার হুমকি’-তেই তাঁরা বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজনৈতিক আঁতাত বা আসল সমঝোতা গড়ে তুলতে পারেন না, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে যার ফায়দা পুরোপুরি গেরুয়া শিবির তুলতে পেরেছিল।
সিপিআই(এম)-এর এই ক্ষোভের যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। যদি এক সপ্তাহের মধ্যে হতে চলা বিধানসভার উপনির্বাচনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব উত্তরবঙ্গের দুটি আসনই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটকে শরিকদের ছাড়তে হয়েছে। কোচবিহারের সিতাইয়ে ফরওয়ার্ড ব্লক লড়বে বলে জেদ ধরে বসে থাকায় সিপিআই(এম) নতুন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের অনুরোধ মেনে ওই আসনটি হাত চিহ্নের জন্য ছেড়ে দিতে পারেন। কিন্তু ২০১৯ এবং ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বলছে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে সিংহ প্রতীকে ৫০ হাজার ভোটও পড়েনি। তাহলে সেই কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে ৭টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে একটিতে ফরওয়ার্ড ব্লক কত ভোট পেতে পারে যে, তারা কংগ্রেসকে আসনটি ছাড়তে তৈরি নয়? আজকের রাজনীতির নিরিখে দাঁড়িয়ে অধিকাংশ বাম দলগুলির শক্তি এবং জনভিত্তির যা অবস্থা, তাতে নতুন ধরনের সমীকরণ তৈরি না করতে পারলে এগোনো তো দূরের কথা, সাইনবোর্ডও কি টিকিয়ে রাখা যাবে?
তাহলে কি বামফ্রন্টের খোলনলচে বদলানোর সময় আসেনি? এই ‘নাম’-এই ৩৪ বছর রাজ্য শাসন করা হয়েছিল এই যুক্তি দেখিয়ে কেন আজকের পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে? এমন নয় বা দীপঙ্কর এমন কোনও ‘সোনালি ভবিষ্যৎ’-এর ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বামফ্রন্টের নাম বদলালেই ভোট এসে যাবে। কিন্তু ওই যে বললাম, যদি আমরা ইংল্যান্ড বা আমেরিকার রাজনীতি থেকে কিছুটা হলেও শেখার চেষ্টা করি, তাহলে বুঝতে হবে সময়ই ঠিক করে দেয় স্লোগান কী হবে? কোন সমীকরণের ভিত্তিতে রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করতে হবে? এমনিতে আমাদের দেশের বামপন্থী দলগুলি বেশ ধীরগতিতে চলে। স্বয়ং জ্যোতি বসু বলে গিয়েছিলেন, সরকারে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক ভুল ছিল। ইতিহাসের আর এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বামেরা কি মোড় ঘোরানো কিছু ভাবতে পারবে? যদি ভাবতে পারে, তাহলেই হয়তো নতুন ‘রোডম্যাপ’ সামনে আসতে পারে।
(লেখক সাংবাদিক)

