উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: মাথা থেকে পা- পুরো শরীরকে সচল রাখতে পর্দার আড়ালে থেকে যে অঙ্গটি অতন্দ্রপ্রহরীর মতো কাজ করে যায় তা হল লিভার। রক্ত পরিস্রুত করা থেকে শুরু করে শরীরের ক্ষতিকারক টক্সিন বের করে দেওয়া, হজমে সাহায্য করা, শক্তি সঞ্চয় – একসঙ্গে প্রায় পঁাচশোরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ একা সামলায় এই অঙ্গটি। অথচ আমাদের বর্তমান অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস আর দৈনন্দিন অবহেলার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে লিভারের ওপরই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, আপনি যদি দীর্ঘায়ু পেতে চান তাহলে সবার আগে নিজের লিভারের যত্ন নেওয়া শিখতে হবে (Liver Health)। কারণ, শরীরের এই কেন্দ্রীয় ইঞ্জিনটি সচল থাকলেই আপনি থাকবেন প্রাণবন্ত। লিখেছেন শিলিগুড়ির নেওটিয়া গেটওয়েল মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ও হেপাটোলজিস্ট ডাঃ মহম্মদ নাদিম পারভেজ।
লিভারের স্বাস্থ্য এবং উদ্বেগ


পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমান বিশ্বে লিভারের রোগের প্রকোপ এক নীরব মহামািরর আকার নিয়েছে। প্রতি বছর সারাবিশ্বে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ লিভারজনিত সমস্যায় প্রাণ হারান। শুধু তাই নয়, বর্তমানে ১৫০ কোটিরও বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। উদ্বেগের বিষয় হল, প্রতি ৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন বর্তমানে MASLD বা মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ-এ আক্রান্ত, যাকে আমরা চলতি ভাষায় ফ্যাটি লিভার বলে থাকি। স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং কায়িক শ্রমের অভাব এবং বিপাকীয় সমস্যা এই রোগের প্রধান অনুঘটক। সময়মতো চিকিৎসা করা না হলে ইনফ্ল্যামেশন, ফাইব্রোসিস, সিরোসিস, লিভার ফেিলওর এমনকি ক্যানসারও হতে পারে।
ভাইরাল হেপাটাইটিস (বি এবং সি), অতিরিক্ত মদ্যপান, অস্বাস্থ্যকর খাবারদাবার, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, স্থূলতা, ডায়াবিটিস এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ বা টক্সিন ঝঁুকির কারণ।
ভালো অভ্যাস, শক্তিশালী লিভার
১৯ এপ্রিল বিশ্ব যকৃৎ দিবসের থিম ছিল ‘সলিড হ্যাবিটস, স্ট্রং লিভার’। অর্থাৎ, রাতারাতি বড় কোনও পরিবর্তন নয়, বরং ছোট ছোট কিছু দৈনিক অভ্যাসের মাধ্যমেই লিভারকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। এক্ষেত্রে চারটি প্রধান অভ্যাসের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যেমন – ব্যালেন্সড ডায়েট করা, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, মদ্যপান এড়িয়ে চলা বা কমানো এবং নিয়মিত লিভার চেকআপ করানো, বিশেষ করে যাঁদের ঝঁুকি রয়েছে। মোদ্দা কথা, প্রতিদিেনর ছোট ছোট অভ্যাসেই লিভারকে সুস্থ রাখা যায়।
প্রতিরোধের উপায়
সুষম ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস – প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে রঙিন শাকসবজি, ফল, চর্বিহীন প্রোটিন ও আঁশ জাতীয় খাবার রাখতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া কমিয়ে ফেলুন।
শারীরিক সক্রিয়তা – অলস জীবনযাপন লিভারের শত্রু। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ঘাম ঝরানো ব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটা লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করে এবং মেটাবলিজম উন্নত করে।
মদ্যপান বর্জন– লিভারের কোষ ধ্বংস করার ক্ষেত্রে অ্যালকোহলের ভূমিকা মারাত্মক। লিভারের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা সিরোসিস এড়াতে মদ্যপান এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
স্ক্রিনিং – লিভারের রোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রাথমিক স্তরে কোনও লক্ষণ দেখায় না। তাই নিয়মিত ব্যবধানে ভাইরাল হেপাটাইটিস এবং লিভার ফাংশন টেস্ট করানো উচিত, বিশেষ করে যাঁদের ঝুঁকি আছে তাঁদের নিয়মিত স্ক্রিনিং করানো উচিত।
ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা – ভাইরাল হেপাটাইটিস (বি ও সি), অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়া, স্থূলতা এবং ডায়াবিটিস লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তবে আশার কথা, হেপাটাইটিস এ এবং বি-এর জন্য যেমন ভ্যাকসিন সহজলভ্য, তেমনই হেপাটাইটিস সি-এর ক্ষেত্রেও এখন অত্যন্ত উন্নত চিকিৎসা ও ওষুধ রয়েছে।
পরিশেষে বলব, সচেতনতা আর সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপে লিভার ক্যানসার বা লিভার বিকল হওয়ার মতো চূড়ান্ত বিপদ রুখে দেওয়া সম্ভব। এজন্য প্রতিদিনের যাপনে সামান্য কিছু সদর্থক পরিবর্তন আনতে হবে। আজ থেকেই শুরু হোক আপনার সেই ‘সলিড’ অভ্যাস, যা আপনার লিভারকে দীর্ঘকাল শক্তিশালী ও সচল রাখবে।

