কে আছে ভারতের পাশে? বাংলাদেশ আজন্ম ছিল চিরসখা। নির্ভরযোগ্য বন্ধু। এমনকি মুজিবুর রহমান পরবর্তী জিয়াউর রহমানের শাসনকালেও। অতীতের সেই সোনালি সম্পর্ক এখন ধূসর। চরম বৈরিতা না থাক, গলায় গলায় বন্ধুত্ব আছে বলা যাবে না। নয়াদিল্লি-ঢাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আশার আলো দেখা যাচ্ছে না কূটনীতির দিগন্তে। পাকিস্তান কখনোই ভারতের বন্ধু ছিল না। দ্বিখণ্ডিত হয়ে দুই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বৈরিতাই ছিল ভবিতব্য।
ধীরে ধীরে নেপাল দূরে সরে গিয়েছে। রাজতন্ত্রের অবসান ও নেপালি কংগ্রেস জমানা শেষে কমিউনিস্ট শাসন কাঠমান্ডুকে নয়াদিল্লি থেকে ক্রমশ সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। ভারতের থেকে দূরত্ব যত বেড়েছে, নেপাল তত চিনের শাসকদের ঘনিষ্ঠ হয়েছে। নানাবিধ পরিকাঠামো উন্নয়ন, আর্থিক সাহায্য ইত্যাদির কারণে ভূ-রাজনীতিতে নেপালের রাশ অনেকটাই বেজিংয়ের হাতে। ভুটানের সঙ্গে বন্ধুত্বের উষ্ণতা আগের চেয়ে হ্রাস পেয়েছে। ভুটানে প্রভাব বিস্তারে চিন অনেকটা সফলও।
তালিবান শাসনের জন্য আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সেরকম কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেকদিন নেই। পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির সাম্প্রতিক বৈরিতার সুযোগ নিতে চেয়েছিল বটে নয়াদিল্লি। কিন্তু অঙ্কুরেই সেই সম্ভাবনা মাটিতে মিশে গিয়েছে বেজিংয়ের তৎপরতায়। দুটি দেশের বিদেশমন্ত্রীদের ডেকে পাঠিয়ে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের দৌত্যে চিনের সাফল্য নিশ্চিত হয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন, দেশের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মায়ানমারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে বিবিধ জট তৈরি করে রেখেছে।
নতুন শাসকের তত্ত্বাবধানে মালদ্বীপ অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু প্রচুর আর্থিক সাহায্যের বিনিময়ে সেই তিক্ততা অনেকখানি ফিকে হয়েছে বটে। কিন্তু সম্পর্কটা বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে- এমন কথা জোর দিয়ে বলার সময় আসেনি। একমাত্র শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতা তেমন নেই বটে। কিন্তু অতীতের মতো নির্ভরযোগ্য বন্ধুত্বটাও আর নেই। প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে ভারতের এই বিচ্ছিন্ন অবস্থার মতো পরিস্থিতি কিন্তু বিশ্বজুড়েই।
নরেন্দ্র মোদিকে বিশ্বগুরুর আসনে প্রতিষ্ঠায় গেরুয়া শিবিরের চেষ্টা কার্যত মাঠে মারা গিয়েছে। অপারেশন সিঁদুর বন্ধ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কৃতিত্ব দাবিকে কেন্দ্র করে সম্পর্কে আঘাত আসতে শুরু করেছিল। সেই ধাক্কায় এখন সম্পর্ক গভীর ফাটলে পরিণত হয়েছে ভারতীয় পণ্যের ওপর আমেরিকার চড়া হারে শুল্ক নির্ধারণকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্পের নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ভারত সুপারিশ না করায় বন্ধুত্ব কার্যত তলানিতে এসে ঠেকেছে।
বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে সেই সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কূটনীতিকে ছাপিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু সেই সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য কিছু ক্ষেত্রে যেমন রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে দুই নৌকায় পা রেখে চলেছিল ভারত। এই কৌশল কিন্তু ধীরে ধীরে বিশ্বে ভারতকে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কোণঠাসা করে রেখেছে। ইজরায়েল বনাম প্যালেস্তাইন ও ইজরায়েল বনাম ইরানের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ সেজে থাকার কৌশল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খুব বেশি সুবিধা দেয়নি নয়াদিল্লিকে।
আমেরিকার সঙ্গে দূরত্ব থাকলে যে অন্য পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা খুব বাড়বে না, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এই পরিস্থিতিতে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনের ফাঁকে চিনের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যত না বন্ধুত্বের জন্য, তার চেয়ে বেশি বাণিজ্যিক তাগিদে। একইসঙ্গে আমেরিকার ওপর পালটা চাপ সৃষ্টির কৌশলও বটে।
নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিংয়ের প্রাথমিক আলোচনায় প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বের কথা প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কূটনৈতিক বন্ধুত্ব কতটা দৃঢ় হবে, তা নিয়ে ধন্দ কাটেনি। ডোকলামে সংঘাতের আগে দু’দেশের সীমান্তে যে পরিস্থিতি ছিল, তা ফিরে আসবে কি না, তার ইঙ্গিত আলোচনায় নেই। সীমান্তে ১ লক্ষ চিনা সৈন্য মোতায়েন থাকলে সেই পরিস্থিতিকে বন্ধুত্ব বলা যায় কি?



