নীহাররঞ্জন ঘোষ, মাদারিহাট : মাহুতকে ফিডিং বোতলে গুঁড়ো দুধ আনতে দেখলেই ছুটে আসছে ‘সে’। ‘সে’ অর্থাৎ ‘লাকি’, গত দুর্যোগে মেচি নদীতে ভেসে যাওয়া যে হস্তীশাবকটির নামকরণ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বনকর্তারা জানাচ্ছেন, খাওয়াদাওয়ার পর ঘুম দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে সেটির। বাকি সময়টা কেটে যাচ্ছে মাহুতদের সঙ্গে খুনশুটি করে। হলং সেন্ট্রাল পিলখানায় সকলের পরিচর্যা ও আদরে বড় হয়ে উঠছে হস্তীশাবকটি।
নদীতে ভেসে যাওয়ার সময় শাবকটির বয়স ছিল মাত্র ১৫ দিন। এই বয়সের হস্তীশাবকটিকে মাতৃস্নেহে বড় করে তুলছেন জলদাপাড়ার অভিজ্ঞ দুজন মাহুত ফারুক ইসলাম ও নির্মল কুজুর। বর্তমানে সেটির বয়স ৪০ দিন পেরিয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি প্রাণী চিকিৎসক উৎপল শর্মার চিকিৎসা ও বনকর্তাদের নজরদারিতে অনেকটাই বিপন্মুক্ত সে।
বনকর্তাদের বয়ান অনুযায়ী, খাবারের প্রতি তেমন কোনও অনীহা নেই মাদি হস্তীশাবকটির। লাকির সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য, ফিডিং বোতলে গুঁড়ো দুধ। মাহুতরাও সেটিকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন। দৃশ্যত মনে হয়, যেন বাবা-মেয়ের খুনশুটি চলছে। জলদাপাড়ার বিভাগীয় বনাধিকারিক পারভিন কাশোয়ান বললেন, ‘শাবকটি স্বাভাবিক রয়েছে। বর্তমানে সেটিকে আইসোলেশন সেন্টার থেকে বের করে একটু জঙ্গলের পরিবেশে রপ্ত করানো হচ্ছে।’
জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের সহকারী বন্যপ্রাণ সংরক্ষক ডঃ নবিকান্ত ঝা জানালেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে পর্যন্ত লাকির ওপর নজর রাখা হয়। নিয়মিত শরীরের পরীক্ষাও করানো হয়। তবে তিনি এ-ও বলেন, ‘হলং সেন্ট্রাল পিলখানায় অন্য দুই অনাথ শাবক গজরাজ ও তিস্তারানিও রয়েছে। কিন্তু ওরা অনেকটাই বড়। সেইজন্য ওকে এখনও ওদের কাছে নেওয়া হয়নি।’
প্রাণী চিকিৎসক উৎপল শর্মা বললেন, ‘শাবকটি অনেকটাই ভালো রয়েছে। তবে, মানুষের বাচ্চা যেমন অসুস্থ হয়, তেমনি হাতির শাবকেরও অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ওরা যেহেতু কথা বলতে পারে না, তাই লাকিকেও মানুষের বাচ্চার মতোই পরিচর্যা করা হচ্ছে।’
বিভাগীয় বনাধিকারিক বলেন, ‘যে কোনও হস্তীশাবককে মায়ের দুধ ছাড়া বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের পরিকাঠামো যথেষ্ট মজবুত থাকায় আমরা এখন পর্যন্ত এব্যাপারে ৯৯ শতাংশ সফল।’
মাহুত ফারুক ইসলাম বলেন, ‘লাকিরা আমাদের সন্তানের মতোই। ওরা অবোলা প্রাণী। কথা বলতে পারে না। সেইজন্য ওদের প্রতি বেশি যত্নশীল হতে হয় আমাদের। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে পর্যন্ত ওর সঙ্গেই থাকি। আত্মীয়পরিজনদের বাড়ি যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আর ওইটুকু দুধের শিশুকে একা ফেলে যেতেও মন চায় না।’ এভাবেই জলদাপাড়ায় সকলের নয়নের মণি হয়ে উঠছে একরত্তিটি।

