বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি: পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় আচমকা বাবার মৃত্যু। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সংসারের ভার এসে পড়ে নাবালক-কাঁধে। সম্বল বলতে বাবার রেখে যাওয়া ফুটপাথে একচিলতে জুতো পালিশের দোকান। ইচ্ছা-অনিচ্ছার দ্বন্দ্বকে সরিয়ে পেটের টানে বাধ্য হয়ে ওই দোকানে গিয়ে বসা। কিন্তু দু’চোখে তো পড়াশোনার স্বপ্ন, চাকরির স্বপ্ন! তাই যে হাতে জুতো পালিশের ব্রাশ তুলেছেন, সেই হাতেই আবার কলম নিয়ে পরীক্ষার খাতায় সমানতালে উত্তর লিখেছেন। তিনি সুশীলচন্দ্র দাস। পেশায় মুচি। কিন্তু তাঁর আরও একটা পরিচয়–তিনি ফার্স্ট ক্লাস গ্র্যাজুয়েট।
সুশীল কোনও উপন্যাসের চরিত্র নন, তিনি বাস্তবের রক্তমাংসের মানুষ। প্রতিদিন তাঁর দেখা পাওয়া যায় ময়নাগুড়ি (Mainaguri) শহরের ট্রাফিক মোড়ে। জরাজীর্ণ দোকানের মাটিতে বসে জুতো সেলাই করেন। কৈশোর থেকে যৌবন পার করেছেন ওই কাজ করতে করতেই। এখন তিনি বার্ধক্যের দোরগোড়ায়। তবে ওই যে, সব গল্পের শেষটা যেমন মধুর হয় না, সুশীলের ক্ষেত্রেও হয়নি। নিজের উৎসাহে জুতো পালিশের সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন, স্নাতকে চোখধাঁধানো রেজাল্ট করেছেন। কিন্তু চাকরি জোটাতে পারেননি। তাই জীবনটা এখনও সাদা-কালোই।


সুশীলের বাড়ি ময়নাগুড়ি শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সিনেমা হলপাড়ায়। ১৯৯৮ সালে ময়নাগুড়ি হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল। ২০০০ সালের গোড়ায় তাঁর দোকানে জুতো সেলাই করতে আসেন ময়নাগুড়ি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক কালীশংকর রায়। কথায় কথায় দুজনের ভাব জমে ওঠে। সুশীলের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে কালীশংকর ২০০১ সালে নিজের উদ্যোগে তাঁকে ময়নাগুড়ি কলেজে ভর্তি করে দেন। সুশীলের বিষয় ছিল ইতিহাস। ফাইনাল ইয়ারের ফল প্রকাশে দেখা যায়, সুশীল ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন।
এরমধ্যেই সুশীল মালতীদেবীকে বিয়ে করেছেন। তাঁর স্নাতক শেষ হতে না হতেই জীবনে আবার বিপর্যয় নামে। মালতী অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্ত্রীকে সুস্থ করতে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় সুশীলের। বেঙ্গালুরুতে নিয়ে যান অর্ধাঙ্গিনীকে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও আর এমএ পড়া হয়নি। কালীশংকরের অবদান ভোলেননি সুশীল। তিনি বলেন, ‘সাংসারিক জটিলতা আর আর্থিক অনটনের জেরে থমকে গিয়েছে সবকিছুই। তবে কালীশংকর স্যরের কথা ভোলার নয়। যতটুকু উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছি সেটা তাঁর দৌলতেই।’
কালীশংকরের কথায়, ‘সুশীলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়। চেষ্টা চালিয়েও টেনে তুলতে পারলাম না। লেখাপড়ায় যথেষ্ট ভালো ছিল। কেউ দেখার নেই। এমন অনেক প্রতিভাই লুকিয়ে রয়েছে, যাদের কেউ খোঁজ নেয় না।’ সুশীলের দুই ছেলে। বড় ছেলে সেলসম্যানের কাজ করেন। পুরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার সোমেশ সান্যাল বলেন, ‘সুশীল যদি লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চান, তাঁর সমস্ত দায়িত্ব আমি নেব।’ রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য একবার সুশীলের দোকান ভাঙাও পড়েছিল। পরে আবার খড়কুটো আঁকড়ে দোকান বানান। সুশীলের মতোই ফুটপাথকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকেন অজস্র মানুষ, আর বেঁচে থাকে তাঁদের জীবনের অবিশ্বাস্য সব গল্প।

