মালবাজার: রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণের (West Bengal Assembly Elections) প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ (CAA)। একদিকে এসআইআরের জেরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাচ্ছে, অপরদিকে সিএএ-তে ভারতের নাগরিকত্ব পাচ্ছেন বাংলাদেশি হিন্দুরা। তৃণমূল কংগ্রেস এসআইআরকে হাতিয়ার করলেও সিএএ অস্ত্রে শান দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার করার চেষ্টা করছে বিজেপি। আর এসবের মাঝেই জলপাইগুড়ি জেলার মাল বিধানসভা (Mal Assembly) এলাকায় অন্তত ৪০ জন হিন্দু বাংলাদেশি শরণার্থীর হাতে এসে পৌঁছেছে বহুকাঙ্ক্ষিত ভারতীয় নাগরিকত্বের শংসাপত্র। ঠিক ভোটের আগেই এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে তৃণমূল (TMC) ও বিজেপির (BJP) মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তর্জা।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, মাল বিধানসভায় সবচেয়ে বেশি সিএএ-তে আবেদন হয়েছে ক্রান্তি ব্লক থেকে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা অত্যন্ত গোপনে আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করেছেন। জলপাইগুড়িতে নির্দিষ্ট অফিসে যেতে হয়েছে শুনানির জন্য। সম্প্রতি এক দম্পতির সিএএ শংসাপত্র এসেছে ক্রান্তির সমাজসেবী রাজীব বালার কাছে। শনিবার সেই শংসাপত্র সেই হিন্দু দম্পতির হাতে তুলে দেন রাজীব। রাজীব জানান, বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষদের আধার বা ভোটার কার্ড থাকলেই তাঁরা বৈধ নাগরিক হন না, সিএএ-র মাধ্যমে তাঁদের সেই আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হল।


মাল বিধানসভার ক্রান্তি ব্লকের ভোজারিপাড়ার বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সি নারায়ণ মণ্ডল এবং তার স্ত্রী রেণু মণ্ডল। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশের ঢাকার বেলতা গ্রাম থেকে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত টপকে ভারতে এসেছিলেন তাঁরা। ২৫ বছর ধরে ক্রান্তিতে বসবাস করলেও মনে ছিল পরিচয় হারানোর ভয়। সম্প্রতি সমাজসেবী সিএএ শংসাপত্র গ্রহণ করে রেণু মণ্ডল আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘নাগরিকত্ব বাতিল নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম, তবে এখন আমরা সম্পূর্ণ ভারতীয় নাগরিক। বাংলাদেশের সেই দুর্দিনের স্মৃতি এখনও মনে পড়লে চোখে জল আসে। পালাতে গিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করেছিল বাংলাদেশের সেনা।’
এই দম্পতি ছাড়াও ঢাকেশ্বরী বালা, রিপন রায় এবং ক্রান্তি বাজারের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক যুগল চন্দ্র মণ্ডলের পরিবারও সিএএ-তে আবেদন করে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেয়েছেন। ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ি, রাজগঞ্জ ব্লকেরও অনেকে সিএএ-তে আবেদন করে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেয়েছেন। মূলত রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ বাবুলাল বালা বিভিন্ন এলাকায় শিবির করে এই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করছেন। তাঁর কথায়, ‘সিএএ-র মাধ্যমে কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ব্যাপার নেই, সবটাই কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকত্ব প্রদানের একটি প্রক্রিয়া।’
মাল ব্লকের গজলডোবা এলাকার একাধিক ব্যক্তিও সিএএ-তে আবেদন করেছেন। যদিও নির্বাচনের কারণে সংবাদমাধ্যমের সামনে পরিচয় খোলসা করতে না চাইলেও তাঁদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বললেও ভুল বুঝিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকি স্থানীয় তৃণমূলের নেতারা সিএএ-তে আবেদন করতে বাধা দিয়েছিল।
নির্বাচনি আবহে মাল বিধানসভায় এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আসরে নেমে পড়েছে দুই রাজনৈতিক শিবির। তৃণমূল কংগ্রেসের মাল টাউন সভাপতি তথা রাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক বোর্ডের সদস্য পুলীন গোলদার দাবি করেছেন, সিএএ বিজেপির কাছে ভোট প্রচারের অংশ, একদিকে কয়েক লক্ষ বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে, আবার অপরদিকে কেন্দ্রীয় সরকার ভারতীয় নাগরিকত্বের শংসাপত্র প্রদান করছে, আর সবটাই হচ্ছে বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে।
যদিও সিএএ-কে নির্বাচনের হাতিয়ার মনে করছে না বিজেপি। জেলা সম্পাদক রাকেশ নন্দী এপ্রসঙ্গে বলেন, ‘সিএএ হল নাগরিকত্বের অধিকার, যারা দীর্ঘ সময় ধরে ভারতে থেকেও বৈধ নাগরিক ছিলেন না, তাঁদের নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত করছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাদের আনন্দ আমাদের কাছে সফলতা।’

