রূপেন্দু দাস, মালদা: নামটাই আজব, হুক্কাহুক্কি। যাঁরা জানেন না, তাঁদের মনে হতে পারে, এর সঙ্গে নির্ঘাত হুঁকোর সম্পর্ক আছে। একেবারেই না। হুকোর সঙ্গে হুক্কাহুক্কির কোনও সম্পর্কই কোনওকালেই ছিল না। তবে মিল এক জায়গায়। হুঁকো জ্বালাতে আগুনের দরকার হয়। আর হুক্কাহুক্কিও জ্বালাতে দরকার হয় আগুনের।
হুক্কাহুক্কি কী? এটা পাটকাঠির তৈরি। এক বান্ডিল পাটকাঠি থেকে গোছাখানেক কাঠি বের করে নিতে হয়। সেগুলিকে মোটামুটি চোখের আন্দাজে ছোট করে দু’ভাগে ভাগ করে নিয়ে দুটোকে অঙ্কের যোগ চিহ্নের মতো দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে পরে পাটকাঠির মাথায় বাঁধতে হয়। কালীপুজোয় কমবেশি সকলেই মোটা টাকার বাজি পোড়ান। যাঁদের তেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই, দীপাবলির সন্ধ্যায় তাঁদের মনোরঞ্জনের জন্য রয়েছে এই হুক্কাহুক্কি।
মঙ্গলবার সকালে হুক্কাহুক্কির সন্ধানে মালদা শহরের মহানন্দার ধারে গিয়ে দেখা গেল, অজস্র ছোট বাড়ি। চাল টালির। দেখলেই বোঝা যায় অভাব সঙ্গে ঘর। তবুও কালীপুজোর সন্ধ্যায় আজও টালির চালে খুদেরা হুক্কাহুকি জ্বালাবে বলে অধীর অপেক্ষায় থাকে।
হুক্কাহুক্কি তৈরি করবে বলে পাটকাঠি জোগাড় করতে বেরিয়েছে শুভজিৎ, সমীর, শুভ্ররা। কালীপুজোয় হুক্কাহুক্কি না বানালে ওদের মন কেমন করে। শুভজিৎ বলে, ‘সারাবছর মন ভালো রাখতে মহানন্দার ধারে সকালে-বিকেলে আমরা খেলাধুলো করি। আর কালীপুজোর সন্ধ্যায় আমাদের মন ভালো করার জন্য রয়েছে হুক্কাহুক্কি। বছরের এই সময়টা বাদে পাটকাঠির দাম খুবই কম থাকে। এই সময় পাটকাটির দাম একটু বেশি। এক বান্ডিল পাটকাঠির দাম ১০ টাকা। একটা হুক্কাহুক্কি বানাতে এক বান্ডিল পাটকাঠি যথেষ্ট। এটা কেউ আমাদের শিখিয়ে দেয়নি। দেখতে দেখতে শিখে নিয়েছি।’
শিবনাথ মাহাতোর কথাই ধরা যাক। বয়স ৬৫। প্রতি বছর কালীপুজোর দিন আর কিছু হোক না হোক, পাটকাঠি কিনে হুক্কাহুক্কি বানাতেই হবে। দুপুরে ছাদে বসে পাটকাঠি দিয়ে তৈরি করছিলেন হুক্কাহুক্কি। শিবনাথ মাহাতো বলেন, ‘ কালীপুজোর সঙ্গে গোবর আর মাটি দিয়ে প্রদীপ আর পাটকাঠির হুক্কাহুক্কি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বিশ্বাস, পাটকাঠির হুক্কাহুক্কি, গোবর ও মাটি দিয়ে তৈরি প্রদীপ জ্বালালে অশুভ শক্তির বিনাশ হয়। ছোট থেকে হুক্কাহুক্কি তৈরি করে এসেছি। যতদিন শরীর দেবে ততদিন কালীপুজোয় হুক্কাহুক্কি তৈরি করে যাবে। এটা আহামরি কিছু নয়। কিন্তু এর মধ্যে একটা নির্ভেজাল আনন্দ মেলে। এই বয়সে সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়।’

