গৌতম সরকার
পিঠেপার্বণের মাস। মেলার-খেলার মাস। ‘ঘরেতে যে আজ কে রবে গো খোলো খোলো দুয়ার খোলো…।’ রবীন্দ্রনাথ পৌষে গেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা ১৪৩২-এর পৌষে জনতার দুয়ার খুলবে কি না, তা নিয়ে ধন্দের শেষ নেই ক্ষমতার কারবারিদের। তাঁদের অবস্থা যেন ‘কোন পথে যে চলি/ কোন কথা যে বলি/ তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই/ মনের চোরাগলি…।’ যদিও সেই কবে মান্না দে’র গানে তাঁদের ভবিতব্য ঠিক হয়ে আছে, ‘সেই গলিতেই ঢুকতে গিয়ে/ হোঁচট খেয়ে দেখি…।’
কোনও গলিই আর সুবিধার হচ্ছে না। এ গলি, সে গলি… ‘ক্লান্ত চরণ আকুল আঁধারে/পথ শুধু খুঁজে মরে…।’ ‘জিতবে আবার বাংলা’ স্লোগানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় ভিড় উপচে পড়ে বৈকি। কিন্তু ইভিএমে ঘাসফুলের বাটন ভরে উঠবে কি না, নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না যে। শেষে এই পৌষের এক সকালে পথ বদলের সুযোগটা এনে দিল ইডি। তৃণমূলের প্রাণভোমরা (এমনই তো মনে হচ্ছে, তাই না?) আইপ্যাক-এর প্রধানের বাড়িতে সাতসকালে তল্লাশি।
অমনি নতুন গলি খুলে গেল। ‘ন্যাস্টি’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে প্রথমে মুখ্যমন্ত্রীর একক অভিযান। সরকারি তদন্ত সংস্থার তল্লাশি চলাকালীন ফাইল, ল্যাপটপ, হার্ড ডিস্ক অকুস্থল থেকে তুলে নিলেন তিনি। আইপ্যাক-এর অফিস থেকেও ফাইলের পর ফাইল গাড়িতে চড়িয়ে পাচার। তার কিছুক্ষণের মধ্যে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের প্রতিবাদ গর্জন। এতেই যেন হবে ‘বিরোধীদের বিসর্জন’।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই চিত্রনাট্য বদলের বাকি বিস্তারিত বলার আগে বিপক্ষের তত্ত্বতালাশ করা যাক। এসআইআর এখন বিজেপির ‘খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না’ দশা। আশা ছিল, রোহিঙ্গা-মুসলিম িমলে দু’কোটি ভোটার হাপিস হয়ে যাবে। তাতে ধাই-কিরিকিরি জয় সময়ের অপেক্ষা। সেই রোহিঙ্গা, মুসলিম নিয়ে এখন মুখে টুঁ শব্দটি নেই। ঘটনাচক্রে কোচবিহারে মহকুমা শাসকের দপ্তরের সামনে কয়েক ঘণ্টা দাঁড়াতে হয়েছিল। দেখলাম, উদ্বিগ্ন মুখে যাঁরা শুনানির লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের ১০০ শতাংশ হিন্দু।
ওই হিন্দু ভোটার থুড়ি ভোটার হওয়ার আবেদনকারীরা মুখে যা নয় তাই ভাষায় গালি দিচ্ছিলেন নির্বাচন কমিশনকে। মুসলিম ভাগাও, হিন্দু বাঁচাও প্রকল্প এসআইআর-এর একেবারে দফারফা যেন। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কানে জনগণের এই অসন্তোষের খবর না পৌঁছানোর কথা নয়। সেকারণেই তিনি সর্বশেষ বাংলা সফরে এসে দলকে ফের সেই অনুপ্রবেেশর তাসে ফেরার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন।
দুর্ভাগ্য বিজেপির যে, মেরুকরণ, অনুপ্রবেশ ইত্যাদি বাংলায় সম্পৃক্তি বিন্দুতে (ইংরেজিতে যাকে বলে স্যাচুরেশন পয়েন্ট) পৌঁছে গিয়েছে। ওই দুই তাস যতটা ভোট টানার টেনে ফেলেছে। বাড়তি টানার জাদুকাঠি আর নেই। শুধু ‘ঘুসপেটিয়া’ চিৎকার তেমন সমর্থন নাও পেতে পারে আঁচ করে ভোটের আগে ইডি, সিবিআইয়ের সক্রিয়তার সেই পুরোনো খেলায় ফিরতে হল। এই খেলাতেও অবশ্য মানুষের আর তেমন রুচি নেই। খেলাটির কার্যকারণ ফাঁস হয়ে গিয়েছে যে। মাঝখান থেকে পোয়াবারো তৃণমূলের।
ইডি তল্লাশি শুরু করতেই অকুস্থলে পৌঁছালেন স্বয়ং রাজ্যের প্রধান। খেলাটা ঘুরিয়ে দিতে বরাবরই ওস্তাদ তিনি। এবার আগেই বলে রেখেছেন, ২০২৬-এ খেলা হবে ‘ফাটাফাটি’। ভিনরাজ্যে বাঙালি নিগ্রহ, বাংলাদেশি তকমা দিয়ে পুশব্যাক, গান্ধিজি, বঙ্কিমচন্দ্রের অবমাননার অভিযোগ কিংবা বাঙালি অস্মিতা ইত্যাদিও যতটুকু জনসমর্থন টানার টেনে ফেলেছে। স্যাচুরেশন পয়েেন্ট পৌঁছে গিয়েছে। খেলা ঘোরাতে তাই নিয়মনীতি, ন্যায়-অন্যায়ের পরোয়া নেই।
আইপ্যাক প্রধানের বাড়ি বা অফিস থেকে ফাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি তুলে আনার মানে তো ইডি’র কাজে বাধা দেওয়াই। ইডি সরকারি তদন্ত সংস্থা। তার মানে সরকারি কাজে বাধাদান হল। আইনে যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মরিয়া তৃণমূল নেত্রী সেসবের তোয়াক্কা করলেন না। নিজের হাতে ‘দলের সম্পত্তি’ ছিনিয়ে আনলেন ইডি’র নাকের ডগা থেকে। সরকারি কাজে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর বাধা দেওয়ার অনন্য নজির হয়ে রইল।
কী আছে ফাইলে, ল্যাপটপে, হার্ড ডিস্কে- কে জানে! তবে দলের সম্পদ নাহয় রক্ষা করলেন দলনেত্রী। তিনি বলতে পারেন, এটা তাঁর দলের গোপনীয়তার অধিকার। তা দলের সম্পদ তিনি রক্ষা করলে করুন। কিন্তু পুলিশকে ব্যবহার কোন আইনে? পুলিশই তো গাড়িতে ফাইল তুলল। তার মানে, পুলিশকে ব্যবহার শাসকদলের একচেটিয়া ‘অধিকার’। তবে সব শাসকেরই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংকেত ছাড়া কি এরাজ্যে সিআইডি একটা কদমও ফেলতে পারে?
ইডি’রও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ইশারা ছাড়া পদক্ষেপ করার উপায় নেই। যে মন্ত্রকের দায়িত্বে অমিত শা। ইডি নিরপেক্ষভাবে কাজ করে কথাটা কি হাতে তুলসীপাতা-বেলপাতা নিয়ে বললেও এদেশে কেউ আর বিশ্বাস করে? তবে ভোটের বাজারে নতুন করে সেটিংয়ের তত্ত্বের আলোচনা জোরালো বাতাস পেয়েছে। সেই জল্পনার সত্যতা থাক বা না থাক, ইডি’র অভিযান যে মমতার হাতে দিল্লি কা লাড্ডু তুলে দিয়েছে, তা তো ঘোর বাস্তব!
আপনার জীবিকা আছে কি না, খেয়ে-পরে বাঁচার মতো আয় আছে কি নেই কিংবা দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি, বেকারত্ব আপাতত ইডি’র তল্লাশি নিয়ে সাতকাহন চর্চার আড়ালে পাঠিয়ে তো দেওয়া গেল। অন্যদিকে, এসআইআর-এ হিন্দু মতুয়াদের অসন্তোষ, আমজনতার হয়রানির অভিযোগ কিছুটা ধামাচাপা পড়ল। বাম, কংগ্রেসের আপাতত দূরে দাঁড়িয়ে এই দ্বিমেরু খেলা দেখা ছাড়া উপায় কী! ‘ফাটাফাটি’ খেলা যে শুধু মমতা ও শা’র মধ্যে। তল্লাশিতে বাধা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আইন ভেঙেছেন বটে। নির্বিবাদে তাঁকে ফাইল নিয়ে যেতে দিয়ে ইডি-ও কি ঘোর অন্যায় করেনি? ইডি’র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তৃণমূল নেত্রীর ফাইল নিয়ে যেতে দেওয়াতেও কি শা’র মন্ত্রকের সিগন্যাল ছিল না? ভোটের চিত্রনাট্য বড় ধাঁধা হে, বড় গোলকধাঁধা।

