অভিরূপ দে ও অনসূয়া চৌধুরী, ময়নাগুড়ি ও জলপাইগুড়ি: কেন্দ্রীয় সরকার দিয়েছে পদ্মশ্রী (Padma Shri), রাজ্য সরকার দিয়েছে বঙ্গরত্ন। অথচ প্রশাসনের দরজায় দিনের পর দিন ঘুরেও সরকারি ঘর পাননি প্রবাদপ্রতিম শিল্পী মঙ্গলাকান্ত রায় (Mangalakanta Roy)। একসময় নিজে বার্ধক্যভাতা পেলেও বেশ কয়েক বছর ধরে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। স্ত্রীর বার্ধক্যভাতাও জোটেনি এখনও। ফলে চরম অনটনে দিন কাটে সারিন্দাশিল্পীর।
সোমবার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় জলপাইগুড়ি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে মঙ্গলাকান্তকে। তঁাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন করিমুল হক। জলপাইগুড়ি মেডিকেলের এমএসভিপি ডাঃ কল্যাণ খান জানিয়েছেন, মঙ্গলাকান্ত রায়ের চিকিৎসার জন্য তিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তিনি হাসপাতালের মেল মেডিকেল ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন। চিকিৎসকরা সবসময় নজর রাখছেন। তঁার অবস্থা স্থিতিশীল হলেও শারীরিক দুর্বলতা রয়েছে।


বাড়ি থেকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িভাড়া করার মতো আর্থিক সংগতি হয়নি শিল্পীর পরিবারের। পদ্মশ্রী ও বঙ্গরত্ন সম্মান পাওয়ার পর ধওলাগুড়ি গ্রামে শিল্পীর বাড়িতে গিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদলের নেতারা একাধিক প্রতিশ্রুতি শুনিয়ে এসেছিলেন। সেই সময় শিল্পী রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তাদের কাছে তাঁর বাড়ির সামনে গ্রামের রাস্তা পাকা ও নিজের ঘরের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। গ্রামের রাস্তা পরবর্তীতে জেলা পরিষদের তরফে পেভার্স ব্লক দিয়ে তৈরি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, পরবর্তীতে কেউ আর তঁার খোঁজ রাখেননি। কোনও সরকারি ভাতা পাওয়া তো দূরের কথা, গ্রাম পঞ্চায়েতের কাছে একাধিকবার আবেদন করেও ঘর বা কোনও সাহায্য পাননি শতায়ু শিল্পী। এমনকি শিল্পীদের জন্য রাজ্য সরকারের যে ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে, সেই ভাতা থেকেও তিনি বঞ্চিত। দরমার বেড়া ও টিন দিয়ে ঘেরা, কাঠের ভাঙা সিঁড়ি, এমনই জরাজীর্ণ একটা ঘরে দিন কাটে মঙ্গলাকান্তর। সামান্য বৃষ্টিতে জল চুঁইয়ে পড়ে। দমকা হাওয়া দিয়ে ভয় হয় কখন ঘর ভেঙে পড়বে।
গ্রামের প্রতিবেশীরাই জানালেন, অনুষ্ঠান না থাকলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সারিন্দা বাজিয়ে চাল-ডাল সংগ্রহের পাশাপাশি সামান্য কিছু আয় করতেন মঙ্গলাকান্ত। এখন বয়সের ভারে অনুষ্ঠান করার ক্ষমতা হারিয়েছেন৷ শেষ সম্বল বলতে ছিল বাড়ির পাশে বিঘা তিনেক জমিতে চাষাবাদ করে যৎসামান্য আয়। কিন্তু, মাস চারেক আগে নাতি কিশোর পথ দুর্ঘটনায় জখম হন। দীর্ঘদিন বেসরকারি হাসপাতালে মরণবাঁচন লড়াই চলে। চিকিৎসার খরচ জোগাতে শেষ সম্বল তিন বিঘা জমিও বন্ধক রাখতে হয়েছে।
মঙ্গলাকান্তবাবুর স্ত্রী চম্পা রায় বলেন, ‘রাজ্য সরকারের থেকে বঙ্গরত্ন সম্মান জানানোর সময় এক লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এর বাইরে কেন্দ্র, রাজ্য কোনও সরকারের কাছ থেকেই কোনওরকম সহযোগিতা পাইনি।’ শিল্পীর ছোট ছেলে দিলীপ রায় আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘কোনও নেতা বা জনপ্রতিনিধি এখন আর বাবার খোঁজ করেন না। চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটছে গোটা পরিবারের।’
মঙ্গলাকান্ত সরকারি সাহায্য থেকে বঞ্চিত, এমন কথা প্রকাশ্যে আসতেই জনপ্রতিনিধি থেকে প্রশাসন সকলেই নড়েচড়ে বসেছেন। জলপাইগুড়ির জেলা শাসক সন্দীপ ঘোষ বলেন, ‘মঙ্গলাকান্তবাবুর চিকিৎসা ব্যাপারটি সরকারের তরফে দেখা হচ্ছে। বাকি সামাজিক সুরক্ষার প্রকল্পের বিষয়গুলিও খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।’
জলপাইগুড়ির সাংসদ জয়ন্ত রায় বলেন, ‘গত বছর মঙ্গলাকান্তবাবুর পরিবারের লোকেদের সঙ্গে কথা বলে ভাতার আবেদনের জন্য কাগজপত্র জমা দেবার কথা বলেছিলাম৷ প্রয়োজনীয় নথি পেলে সরকারি সহযোগিতা পাওয়ার ব্যাপারে যোগাযোগ করা সম্ভব হত।’
ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কুমুদরঞ্জন রায় জানিয়েছেন, শিল্পীর সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়টি তঁার জানাই ছিল না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।’

