শুভঙ্কর চক্রবর্তী
জাতিগত দাঙ্গার আগুনে জ্বলতে থাকা মণিপুরে (Manipur) ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের নীল নকশা তৈরি করেছে জঙ্গিরা। ডামাডোলের সুযোগে ‘ওয়ার জোন’ বানিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে মণিপুরকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছকেছে দেশবিরোধী শক্তিগুলো। এমনটাই আশঙ্কা করছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাকর্তারা। সম্প্রতি গোয়েন্দাদের তরফে মণিপুর নিয়ে কেন্দ্রের কাছে বিশেষ রিপোর্ট জমা পড়েছে। তাতেই আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই জেলায় জেলায় বাংকার তৈরি করে অস্ত্র মজুত করতে শুরু করেছে জঙ্গিরা। উখরুল, কামজং, বিষ্ণুপুর, চান্দেল, চূড়াচন্দ্রপুর, কাংপোকপি জেলার বিভিন্ন এলাকায় অতিসক্রিয় হয়েছে কুড়িটিরও বেশি ছোট জঙ্গিগোষ্ঠী। ছয় জেলায় কয়েক হাজার বাংকার তৈরি করে ঘাঁটি গেড়েছে জঙ্গিরা। লস্কর-ই-তৈবা এবং জইশ-ই-মহম্মদের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো পর্দার আড়াল থেকে মণিপুরে কলকাঠি নাড়ছে। অস্ত্র, অর্থ, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ সমস্তভাবেই রসদ জোগাচ্ছে লস্কর ও জইশ। সবমিলিয়ে উত্তর-পূর্বের রাজ্যটি যে বিস্ফোরক পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে তা স্বীকার করে নিয়েছেন গোয়েন্দারা।


সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, মণিপুরের স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ভেতরে নিজেদের স্লিপার সেলের সদস্যদের ঢুকিয়ে দিয়েছে জঙ্গিরা। তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ করতে বিদ্রোহ জিইয়ে রাখছে। গোয়েন্দারা বলছেন, মায়ানমার সীমান্তকে ব্যবহার করে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র। লস্কর এবং জইশের মতো গোষ্ঠীগুলো মায়ানমারের দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রশিক্ষণ শিবির খুলে মণিপুরের স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যদের গেরিলা যুদ্ধ ও ড্রোন আক্রমণের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সম্প্রতি নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযানে বিষ্ণুপুর, কামজং, চূড়াচন্দ্রপুর সহ বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে বাংকার ধ্বংস করে যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, তা দেখে দুঁদে সেনাকর্তাদেরও চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের তালিকায় আমেরিকার তৈরি এম-১৬ অ্যাসল্ট রাইফেল, চিনা কিউএসজেড-৯২ পিস্তল, অত্যাধুনিক স্নাইপার রাইফেল, একে সিরিজের বিভিন্ন রাইফেল রয়েছে। প্রচুর পরিমাণে ল্যান্ডমাইন, রকেট লঞ্চার, গ্রেনেড, মর্টার উদ্ধার হয়েছে, যা সাধারণত নিয়মিত সেনাবাহিনী ব্যবহার করে। এক সেনাকর্তার বক্তব্য, ‘উদ্ধার হওয়া যুদ্ধাস্ত্রের প্রযুক্তি ও গুণমান দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, এর পেছনে নিশ্চিতভাবেই লস্কর বা জইশের মতো শক্তিশালী জঙ্গি সংগঠনের সরাসরি মদত রয়েছে।’
সেনা গোয়েন্দাদের রিপোর্ট অনুসারে, সম্প্রতি উখরুলের মংকট চেপু, সংফেল, মুল্লাম, সারারখং এলাকায় প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র মজুত করা হয়েছে। সেই মর্মে গত এক সপ্তাহে সেনা ও মণিপুর পুলিশ এলাকাগুলিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে শতাধিক বাংকার নষ্ট করেছে এবং প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার করেছে। দুজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। মণিপুরের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিরা রাজ্যের বিভিন্ন পয়েন্টে একের পর এক শক্তিশালী বাংকার ও ঘাঁটি তৈরি করেছে। বিশেষ করে চূড়াচন্দ্রপুর, বিষ্ণুপুর এবং কাংপোকপি জেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বাংকারগুলো তৈরি করা হয়েছে। সেনা রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুধু বালির বস্তা নয়, বাংকারগুলি মাটির অনেকটা গভীরে কংক্রিটের আস্তরণ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে পাহাড়ের প্রাকৃতিক গুহাকে ব্যবহার করে তার মুখ কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে, যাতে আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমেও সেগুলির হদিস পাওয়া সম্ভব না হয়। অসম রাইফেলসের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, মণিপুরের পাহাড়ি এলাকায় যেভাবে বাংকার তৈরি করে হচ্ছে তার কৌশল হুবহু পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জঙ্গি লঞ্চ প্যাডগুলোর মতো। প্রতিটি বাংকার থেকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় নজরদারি চালানোর জন্য হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরা এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক সিগন্যাল জ্যামারও ব্যবহার করা হচ্ছে বলেই অনুমান সেনাকর্তাদের।
সূত্রের খবর, মায়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অস্ত্র পাচারের কারবার এখন তুঙ্গে। রাতের অন্ধকারে জঙ্গলে ঢাকা গোপন পথে অস্ত্র ঢুকছে মণিপুরে। এতে বিশাল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হচ্ছে, যার উৎস মূলত আন্তর্জাতিক মাদক কারবার। সেনাকর্তাদের মতে, যে ধরনের আইইডি বা বিস্ফোরক বাংকার থেকে পাওয়া যাচ্ছে, তা বানানোর প্রযুক্তি একমাত্র পেশাদার জেহাদি সংগঠনগুলোর কাছেই থাকে। এর অর্থ হল, প্রশিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞ জঙ্গিরা সরাসরি ওইসব এলাকায় যাতায়াত করছে অথবা ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়মিত নির্দেশ পাঠাচ্ছে। সেনার বিশেষ রিপোর্টের ভিত্তিতে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রকের কর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। রাজ্যজুড়ে ইতিমধ্যেই হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। বিশেষ দল গড়ে নিয়মিত অভিযানও শুরু হয়েছে। মণিপুরের প্রায় ৩৫০টি স্পর্শকাতর এলাকা চিহ্নিত করে সেনা ও পুলিশের যৌথ নাকা চেকিং পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা তল্লাশি চলছে। এক গোয়েন্দাকর্তার বক্তব্য, ‘বিভিন্ন সুরক্ষাবাহিনীর বিশেষ জওয়ানদের নিয়ে একাধিক বিশেষ দল তৈরি করে অভিযান শুরু হয়েছে। জঙ্গিদের ছক বানচাল করতে স্থানীয়দেরও সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।’

